বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ কেবল পদ-পদবির পরিচয়ে পরিচিত হন না—তাঁরা পরিচিত হন দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, সাহস ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস দিয়ে। হেলেন জেরিন খান তেমনই এক রাজনৈতিক নাম—যাঁকে তাঁর সমর্থকেরা রাজপথের লড়াকু সৈনিক, নারী নেতৃত্বের অগ্রগামী এবং দক্ষিণবঙ্গের অগ্নিকন্যা হিসেবে অভিহিত করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছেন। রাজপথের আন্দোলন, সংগঠনের কঠিন সময় এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথা তাঁর অনুসারীরা স্মরণ করেন। বিশেষ করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর কাছে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী নেতৃত্ব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীরা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও একজন নারীকে দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন, সাংগঠনিক রাজনীতি এবং সংসদীয় রাজনীতিতে একইসঙ্গে সক্রিয় থাকা সহজ নয়। হেলেন জেরিন খানের রাজনৈতিক পথচলা সেই বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত—এমনটাই মনে করেন তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা।
তাঁর সমর্থকদের দাবি অনুযায়ী, তিনি তিনবারের নারী সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শিক্ষা-সম্পর্কিত দায়িত্ব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে দলের গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে রাজনৈতিক পদ বা সংসদীয় পরিচয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—একজন কর্মী হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদান রাষ্ট্র ও দল কতটা মূল্যায়ন করছে?
আজ সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
সম্মান শুধু পুরস্কার নয়, রাজনৈতিক স্বীকৃতিও
কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে সম্মানিত করার অর্থ শুধু একটি পদ দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
হেলেন জেরিন খানের ক্ষেত্রে তৃণমূলের প্রত্যাশাটিও তাই কেবল ব্যক্তিগত পদলাভের দাবি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হতে পারে নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার একটি রাজনৈতিক বার্তা।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। বিশেষ করে যারা প্রতিকূল সময়ে মাঠে ছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হলে প্রশাসন ও রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যোগ্যতার মূল্যায়ন জরুরি
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবে, তাঁদের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
এই বিবেচনায় হেলেন জেরিন খানের নাম তৃণমূলের পক্ষ থেকে সামনে আসা স্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একজন নেতাকে শুধু রাজনীতি বুঝতে সাহায্য করে না; তাঁকে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মাঠের বাস্তবতা এবং সংগঠনের সংকটও বুঝতে শেখায়।
তবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিধান এবং ব্যক্তির যোগ্যতার ওপর। রাজনৈতিক আনুগত্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত মূল মানদণ্ড।
মাদারীপুরের মানুষের প্রত্যাশা
দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিতে মাদারীপুরের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। ফলে মাদারীপুরের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যখন জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে এলাকার মানুষের আবেগও যুক্ত হয়ে যায়।
হেলেন জেরিন খানকে ঘিরে মাদারীপুরের তৃণমূলের যে আবেগের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে নিজেদের একজন প্রতিনিধিকে জাতীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকায় দেখার আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষাকে শুধু দলীয় আবেগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যায়নের বৃহত্তর প্রত্যাশারও প্রতিফলন।
সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান
সরকারের প্রতি তৃণমূলের আহ্বান তাই স্পষ্ট—যাঁরা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন, যাঁরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, যাঁরা সংগঠনকে কঠিন সময়ে ধরে রেখেছেন এবং যাঁদের জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করুন।
হেলেন জেরিন খানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তাঁকে সম্মানিত করা হলে সেটি শুধু একজন নারী নেত্রীর সম্মান হবে না; বরং বাংলাদেশের নারী রাজনীতির দীর্ঘ সংগ্রামকেও সম্মান জানানো হবে। এটি হবে তৃণমূলের কর্মীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি দৃষ্টান্ত এবং রাজনীতিতে ত্যাগের মূল্য আছে—এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ।
রাজনীতিতে পদ আসে, পদ চলে যায়। সংসদীয় আসনও একসময় অন্য কারও হাতে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা তৈরি হয়, সেটি কোনো পদ দিয়ে মাপা যায় না।
হেলেন জেরিন খানকে তাঁর সমর্থকেরা সেই জায়গাতেই দেখতে চান—একজন সংগ্রামী নারী, একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং একজন নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।
তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তৃণমূলের দাবি তাই কেবল একজন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করার আহ্বান নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতির দাবি। সরকারের উচিত দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রতিটি সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা।
কারণ যে নারী প্রতিকূলতার সময় রাজপথে দাঁড়াতে জানেন, জনগণের কথা বলতে জানেন এবং সংগঠনের কঠিন সময়ে কর্মীদের পাশে থাকতে জানেন—তাঁর অভিজ্ঞতা যদি রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে কাজে লাগে, তবে সেটিই হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।
হেলেন জেরিন খানকে ঘিরে তৃণমূলের এই প্রত্যাশা তাই নতুন কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহের দাবি নয়—যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের দাবি। আর সেই মূল্যায়ন যদি সত্যিই হয়, তবে তা শুধু মাদারীপুর নয়, বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 






















