ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল: একজন দলীয় নেতার সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরীক্ষা। শিক্ষার্থী ফেল করেনি, ফেল করেছে বাংলাদেশ। পরীক্ষার ফলাফলের আয়নায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকি, হয়রানি ও ফেসবুকে অপপ্রচারের অভিযোগ,কুড়িগ্রাম থানায় প্রথম টিভির চেয়ারম্যানের লিখিত অভিযোগ। মিটফোর্ডের সুইপার কলোনির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতপাত বিলোপ জোটের আয়োজনে মানববন্ধন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ: ফ্যাসিবাদের দোসর মোঃ শহীদ আতাহার হোসেন এর গ্রাসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর! গোয়েন্দা সংস্থার পদক্ষেপ জরুরী, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আমলা ও গুপ্ত সিন্ডিকেটের নানামুখি চক্রান্ত! মাকে কাঁধে করে ছেলের ভিক্ষাবৃত্তি। কুমিল্লার লাকসামের সোহান হত্যা মামলায় মিজানুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পার্কিং করা গাড়িতে আগুন। সরকারি রাস্তা দখল করে পাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ, এলাকাবাসীর ক্ষোভ।

বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল: একজন দলীয় নেতার সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরীক্ষা।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো কেবল সংবাদ নয়—সময়কে নতুন করে পড়ার সুযোগ তৈরি করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার সম্ভাবনার আলোচনাও তেমনই একটি মুহূর্ত।

একজন রাজনৈতিক দলের মহাসচিব যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ান, তখন প্রশ্নটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—একজন দলীয় নেতা রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারবেন কি না।

কারণ দলীয় রাজনীতিতে আপন-পর আছে। রাষ্ট্রের কাছে আপন-পর থাকার কথা নয়।

দলীয় রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিপক্ষও নাগরিক।

দলীয় রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকে। রাষ্ট্রের কাছে থাকে কেবল সংবিধান, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার।

এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

একজন মির্জা ফখরুল, একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির বহু কঠিন সময়ের সাক্ষী ও অংশীদার।

রাজনীতির উত্তপ্ত মাঠ, আন্দোলনের দিন, মামলা-হামলা, রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা।

সেই পথের শেষে যদি বঙ্গভবনের দরজা তাঁর জন্য খুলে যায়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের এক বিরাট পরিবর্তন।

কিন্তু এখানেই একটি গভীর সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—

বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে একজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচয় বড় হয়ে যায়।

যে মানুষটি এতদিন একটি দলের মহাসচিব ছিলেন, তাঁকেই তখন হয়ে উঠতে হবে ১৮ কোটি মানুষের রাষ্ট্রপতি।

এখানেই রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার পথ।

দলীয় পরিচয় থেকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়

মির্জা ফখরুলের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে নিজের রাজনৈতিক অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই অতীতকে অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

তাঁকে মনে রাখতে হবে, বঙ্গভবনে বসে কোনো নাগরিকের কপালে বিএনপির সমর্থক, আওয়ামী লীগের সমর্থক, জামায়াতের সমর্থক কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সিল খোঁজা রাষ্ট্রপতির কাজ নয়।

রাষ্ট্রপতির চোখে একজন কৃষক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একজন শ্রমিকও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ব্যবসায়ী যেমন নাগরিক, একজন রিকশাচালকও তেমনই নাগরিক।

সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।

আর এখানেই একজন রাষ্ট্রপতির মহত্ত্ব।

রাষ্ট্রপতির আসন—ক্ষমতার নয়, আস্থার

রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল ক্ষমতার কাঠামোর একটি শীর্ষস্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এই পদটি মানুষের কাছে রাষ্ট্রের নৈতিক মুখ।

গ্রামের কোনো অসহায় মানুষ যখন অন্যায়ের শিকার হয়ে রাষ্ট্রের দিকে তাকায়, তখন সে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা সংসদের সাংবিধানিক জটিলতা বোঝে না। সে শুধু ভাবে—রাষ্ট্র কি আমার পাশে আছে?

কোনো সংখ্যালঘু পরিবার যখন নিরাপত্তাহীনতায় রাত কাটায়, কোনো দরিদ্র মানুষ যখন বিচার পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, কোনো রাজনৈতিক মতের মানুষ যখন নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কিত হয়—তখন রাষ্ট্রের প্রতীকী অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, নিরাপত্তা কিংবা বঙ্গভবনের ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা।

তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে—মানুষের আস্থা।

বিএনপির জন্যও এটি বড় পরীক্ষা

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির রাজনীতিতেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসবে। নতুন নেতৃত্বকে দল পরিচালনা করতে হবে। নতুন মহাসচিবকে সামলাতে হবে দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল।

কিন্তু বিএনপির জন্য এর চেয়েও বড় বিষয় হলো—তাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাবেন, তখন দলটির কাছ থেকেও মানুষ পরিণত রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করবে।

রাষ্ট্রপতি যদি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর দলকেও সেই সাংবিধানিক দূরত্বকে সম্মান করতে হবে।

কারণ রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একজন ব্যক্তি নন—ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান।

সংখ্যালঘুর চোখে বঙ্গভবন

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের অনেকের মনে এখনও নিরাপত্তা, সম্পত্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নানা আশঙ্কা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের দিকে তাই তাঁদের প্রত্যাশার চোখও থাকবে।

তাঁরা দেখতে চাইবেন—রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার?

তাঁরা দেখতে চাইবেন—ধর্ম কি নাগরিক অধিকারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াবে, নাকি সংবিধানই হবে সবার শেষ আশ্রয়?

তাঁরা দেখতে চাইবেন—বঙ্গভবনের দরজা কি কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য, নাকি নিঃস্ব মানুষের কান্নাও সেখানে পৌঁছাতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রপতির অবস্থান ও নৈতিক নেতৃত্বে দিতে হবে।

বিরোধী মতের মানুষের জন্যও রাষ্ট্রপতি

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—সবাই একই কথা বলবে না।

কেউ সরকারের পক্ষে থাকবে, কেউ বিরোধিতা করবে। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ সমালোচনা করবে।

রাষ্ট্রপতির কাছে এই বিভেদ অপ্রাসঙ্গিক।

বরং গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষটিও রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান নিরাপত্তা ও অধিকার পায়।

মির্জা ফখরুল যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁর একটি বাক্যই হয়তো মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হবে—

“আমি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নই; আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।”

এই বাক্য যদি শুধু বক্তৃতায় না থেকে তাঁর রাষ্ট্রীয় আচরণের দর্শন হয়ে ওঠে, তাহলেই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব অর্থবহ হবে।

ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে?

ইতিহাসের কাছে পদ বড় নয়, মানুষের জন্য করা কাজ বড়।

অনেকেই রাষ্ট্রের বড় পদে বসেছেন। কেউ স্মরণীয় হয়েছেন, কেউ বিস্মৃত হয়েছেন।

কেউ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছেন, কেউ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির ছায়ায় নিয়ে গেছেন।

মির্জা ফখরুলের সামনেও তাই আজ একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন—

তিনি কি কেবল একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবেই বঙ্গভবনে যাবেন, নাকি একজন নিরপেক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে।

শেষ কথা: বঙ্গভবনের দরজা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সামনে যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এসে দাঁড়ায়, তবে এটি শুধু তাঁর জন্য সম্মানের নয়—এটি তাঁর জন্য এক বিরাট দায়ও।

কারণ বঙ্গভবনের চেয়ার নরম হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন।

সেখানে বসে দলীয় কর্মীর চোখের জল যেমন দেখতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

নিজের সমর্থকের অন্যায় যেমন দেখতে হবে, তেমনি বিরোধীর ওপর অন্যায়ও থামাতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠের উল্লাস যেমন শুনতে হবে, তেমনি নিঃশব্দ সংখ্যালঘুর কান্নাও শুনতে হবে।

আর রাষ্ট্রপতির প্রকৃত সাফল্য হবে সেদিন, যেদিন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন মানুষটিও মনে করবে—

“এই রাষ্ট্রে আমারও একজন অভিভাবক আছেন।”

মির্জা ফখরুলের সামনে সেই সুযোগ আসতে পারে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে একজন দলীয় নেতা যদি রাষ্ট্রের অভিভাবকের আসনে বসেন, তাহলে তাঁর সামনে ইতিহাসের একটি দরজা খুলে যাবে।

সেই দরজা দিয়ে তিনি কী নিয়ে প্রবেশ করবেন—দলের পরিচয়, নাকি বাংলাদেশের পরিচয়?

ইতিহাসের বিচার একদিন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে।

আর সেই দিন হয়তো মানুষ বলবে—

তিনি শুধু বঙ্গভবনে বসেননি; তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

অথবা ইতিহাস আরও কঠিন ভাষায় বলবে—

তিনি রাষ্ট্রপতির পদ পেয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠতে পারেননি।

এখন সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে।

সময়ের অপেক্ষা—তিনি কোন ইতিহাসটি লিখবেন।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল: একজন দলীয় নেতার সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরীক্ষা।

বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল: একজন দলীয় নেতার সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরীক্ষা।

আপডেট সময় : ১০:২৭:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো কেবল সংবাদ নয়—সময়কে নতুন করে পড়ার সুযোগ তৈরি করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার সম্ভাবনার আলোচনাও তেমনই একটি মুহূর্ত।

একজন রাজনৈতিক দলের মহাসচিব যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ান, তখন প্রশ্নটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—একজন দলীয় নেতা রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারবেন কি না।

কারণ দলীয় রাজনীতিতে আপন-পর আছে। রাষ্ট্রের কাছে আপন-পর থাকার কথা নয়।

দলীয় রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিপক্ষও নাগরিক।

দলীয় রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকে। রাষ্ট্রের কাছে থাকে কেবল সংবিধান, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার।

এই জায়গাটিই মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

একজন মির্জা ফখরুল, একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির বহু কঠিন সময়ের সাক্ষী ও অংশীদার।

রাজনীতির উত্তপ্ত মাঠ, আন্দোলনের দিন, মামলা-হামলা, রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা।

সেই পথের শেষে যদি বঙ্গভবনের দরজা তাঁর জন্য খুলে যায়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের এক বিরাট পরিবর্তন।

কিন্তু এখানেই একটি গভীর সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—

বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে একজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচয় বড় হয়ে যায়।

যে মানুষটি এতদিন একটি দলের মহাসচিব ছিলেন, তাঁকেই তখন হয়ে উঠতে হবে ১৮ কোটি মানুষের রাষ্ট্রপতি।

এখানেই রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার পথ।

দলীয় পরিচয় থেকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়

মির্জা ফখরুলের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে নিজের রাজনৈতিক অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই অতীতকে অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

তাঁকে মনে রাখতে হবে, বঙ্গভবনে বসে কোনো নাগরিকের কপালে বিএনপির সমর্থক, আওয়ামী লীগের সমর্থক, জামায়াতের সমর্থক কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সিল খোঁজা রাষ্ট্রপতির কাজ নয়।

রাষ্ট্রপতির চোখে একজন কৃষক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একজন শ্রমিকও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ব্যবসায়ী যেমন নাগরিক, একজন রিকশাচালকও তেমনই নাগরিক।

সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।

আর এখানেই একজন রাষ্ট্রপতির মহত্ত্ব।

রাষ্ট্রপতির আসন—ক্ষমতার নয়, আস্থার

রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল ক্ষমতার কাঠামোর একটি শীর্ষস্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এই পদটি মানুষের কাছে রাষ্ট্রের নৈতিক মুখ।

গ্রামের কোনো অসহায় মানুষ যখন অন্যায়ের শিকার হয়ে রাষ্ট্রের দিকে তাকায়, তখন সে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা সংসদের সাংবিধানিক জটিলতা বোঝে না। সে শুধু ভাবে—রাষ্ট্র কি আমার পাশে আছে?

কোনো সংখ্যালঘু পরিবার যখন নিরাপত্তাহীনতায় রাত কাটায়, কোনো দরিদ্র মানুষ যখন বিচার পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, কোনো রাজনৈতিক মতের মানুষ যখন নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কিত হয়—তখন রাষ্ট্রের প্রতীকী অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, নিরাপত্তা কিংবা বঙ্গভবনের ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা।

তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে—মানুষের আস্থা।

বিএনপির জন্যও এটি বড় পরীক্ষা

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির রাজনীতিতেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসবে। নতুন নেতৃত্বকে দল পরিচালনা করতে হবে। নতুন মহাসচিবকে সামলাতে হবে দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল।

কিন্তু বিএনপির জন্য এর চেয়েও বড় বিষয় হলো—তাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাবেন, তখন দলটির কাছ থেকেও মানুষ পরিণত রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করবে।

রাষ্ট্রপতি যদি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর দলকেও সেই সাংবিধানিক দূরত্বকে সম্মান করতে হবে।

কারণ রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একজন ব্যক্তি নন—ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান।

সংখ্যালঘুর চোখে বঙ্গভবন

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের অনেকের মনে এখনও নিরাপত্তা, সম্পত্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নানা আশঙ্কা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের দিকে তাই তাঁদের প্রত্যাশার চোখও থাকবে।

তাঁরা দেখতে চাইবেন—রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার?

তাঁরা দেখতে চাইবেন—ধর্ম কি নাগরিক অধিকারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াবে, নাকি সংবিধানই হবে সবার শেষ আশ্রয়?

তাঁরা দেখতে চাইবেন—বঙ্গভবনের দরজা কি কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য, নাকি নিঃস্ব মানুষের কান্নাও সেখানে পৌঁছাতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রপতির অবস্থান ও নৈতিক নেতৃত্বে দিতে হবে।

বিরোধী মতের মানুষের জন্যও রাষ্ট্রপতি

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—সবাই একই কথা বলবে না।

কেউ সরকারের পক্ষে থাকবে, কেউ বিরোধিতা করবে। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ সমালোচনা করবে।

রাষ্ট্রপতির কাছে এই বিভেদ অপ্রাসঙ্গিক।

বরং গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষটিও রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান নিরাপত্তা ও অধিকার পায়।

মির্জা ফখরুল যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁর একটি বাক্যই হয়তো মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হবে—

“আমি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নই; আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।”

এই বাক্য যদি শুধু বক্তৃতায় না থেকে তাঁর রাষ্ট্রীয় আচরণের দর্শন হয়ে ওঠে, তাহলেই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব অর্থবহ হবে।

ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে?

ইতিহাসের কাছে পদ বড় নয়, মানুষের জন্য করা কাজ বড়।

অনেকেই রাষ্ট্রের বড় পদে বসেছেন। কেউ স্মরণীয় হয়েছেন, কেউ বিস্মৃত হয়েছেন।

কেউ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছেন, কেউ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির ছায়ায় নিয়ে গেছেন।

মির্জা ফখরুলের সামনেও তাই আজ একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন—

তিনি কি কেবল একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবেই বঙ্গভবনে যাবেন, নাকি একজন নিরপেক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে।

শেষ কথা: বঙ্গভবনের দরজা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সামনে যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এসে দাঁড়ায়, তবে এটি শুধু তাঁর জন্য সম্মানের নয়—এটি তাঁর জন্য এক বিরাট দায়ও।

কারণ বঙ্গভবনের চেয়ার নরম হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন।

সেখানে বসে দলীয় কর্মীর চোখের জল যেমন দেখতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

নিজের সমর্থকের অন্যায় যেমন দেখতে হবে, তেমনি বিরোধীর ওপর অন্যায়ও থামাতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠের উল্লাস যেমন শুনতে হবে, তেমনি নিঃশব্দ সংখ্যালঘুর কান্নাও শুনতে হবে।

আর রাষ্ট্রপতির প্রকৃত সাফল্য হবে সেদিন, যেদিন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন মানুষটিও মনে করবে—

“এই রাষ্ট্রে আমারও একজন অভিভাবক আছেন।”

মির্জা ফখরুলের সামনে সেই সুযোগ আসতে পারে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে একজন দলীয় নেতা যদি রাষ্ট্রের অভিভাবকের আসনে বসেন, তাহলে তাঁর সামনে ইতিহাসের একটি দরজা খুলে যাবে।

সেই দরজা দিয়ে তিনি কী নিয়ে প্রবেশ করবেন—দলের পরিচয়, নাকি বাংলাদেশের পরিচয়?

ইতিহাসের বিচার একদিন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে।

আর সেই দিন হয়তো মানুষ বলবে—

তিনি শুধু বঙ্গভবনে বসেননি; তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

অথবা ইতিহাস আরও কঠিন ভাষায় বলবে—

তিনি রাষ্ট্রপতির পদ পেয়েছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠতে পারেননি।

এখন সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে।

সময়ের অপেক্ষা—তিনি কোন ইতিহাসটি লিখবেন।