ঢাকা ০৫:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
শিক্ষার্থী ফেল করেনি, ফেল করেছে বাংলাদেশ। পরীক্ষার ফলাফলের আয়নায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকি, হয়রানি ও ফেসবুকে অপপ্রচারের অভিযোগ,কুড়িগ্রাম থানায় প্রথম টিভির চেয়ারম্যানের লিখিত অভিযোগ। মিটফোর্ডের সুইপার কলোনির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতপাত বিলোপ জোটের আয়োজনে মানববন্ধন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ: ফ্যাসিবাদের দোসর মোঃ শহীদ আতাহার হোসেন এর গ্রাসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর! গোয়েন্দা সংস্থার পদক্ষেপ জরুরী, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আমলা ও গুপ্ত সিন্ডিকেটের নানামুখি চক্রান্ত! মাকে কাঁধে করে ছেলের ভিক্ষাবৃত্তি। কুমিল্লার লাকসামের সোহান হত্যা মামলায় মিজানুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পার্কিং করা গাড়িতে আগুন। সরকারি রাস্তা দখল করে পাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ, এলাকাবাসীর ক্ষোভ। উচ্ছেদ নয়, আগে পুনর্বাসন: মিটফোর্ড সুইপার কলোনির সংকট রাষ্ট্রের মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সংবিধানের পরীক্ষা।

শিক্ষার্থী ফেল করেনি, ফেল করেছে বাংলাদেশ। পরীক্ষার ফলাফলের আয়নায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

 

প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গভীর প্রশ্নের নাম। ২০২৬ সালের SSC ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মোট পাসের হার নেমে এসেছে ৬২.২৫ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাত লাখ শিক্ষার্থী কি সত্যিই ফেল করেছে? নাকি তাদের ফলাফলের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষানীতি, শিক্ষকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সামাজিক বাস্তবতার ব্যর্থতাই প্রকাশ পেয়েছে?

আমরা যদি প্রতিবার ফল প্রকাশের পর শুধু বলি—‘এত শিক্ষার্থী ফেল করেছে’, তাহলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় একটি সংখ্যা বা একটি গ্রেড মাত্র। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, একজন শিক্ষক, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি শিক্ষাব্যবস্থা এবং একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ।

একটি শিশুকে আমরা কী শেখাচ্ছি?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানে—আমরা শিক্ষার্থীকে শেখাচ্ছি পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করতে হয়; কিন্তু সবসময় শেখাচ্ছি না কীভাবে শিখতে হয়।

শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি করা, প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো, বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে শেখানো। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক।

ফলে শিক্ষার্থী বই পড়ে পরীক্ষায় পাস করার জন্য। অভিভাবক সন্তানের ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। শিক্ষক ফলাফল নিয়ে চাপের মধ্যে থাকেন। প্রতিষ্ঠান ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতায় নামে। আর রাষ্ট্র হিসাব করে পাসের হার দিয়ে।

কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে যায়—

শিক্ষার্থী আসলে কতটা শিখল?

সাত লাখ শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় কার?

একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি বিষয়ে ফেল করলেই আমরা খুব সহজেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘অমনোযোগী’ কিংবা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু একটি শিশুর ব্যর্থতার কারণ কি এত সরল?

কোনো শিক্ষার্থী হয়তো পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটে পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারেনি। কেউ হয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছে। কেউ ভালো শিক্ষক পায়নি। কেউ হয়তো দীর্ঘদিন কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার চাপে নিজের মৌলিক শেখার ক্ষমতা হারিয়েছে।

আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, ল্যাবরেটরি ও পাঠাগারের অভাব কিংবা শিক্ষার পরিবেশের দুর্বলতাও শিক্ষার্থীর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করব কেন?

ফলাফল কমেছে—এটি কি শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা?

২০২৬ সালের SSC ফলাফলে পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে GPA-5 পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে।

এই পতনকে শুধুই ‘শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু সহজ ব্যাখ্যা সবসময় সঠিক ব্যাখ্যা নয়।

প্রশ্ন করতে হবে—

শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ কেমন ছিল?

শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুত ছিলেন?

শিক্ষাপদ্ধতি কতটা কার্যকর ছিল?

পাঠ্যক্রম কি বয়স ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

পরীক্ষার প্রশ্ন কি মুখস্থনির্ভরতার বাইরে গিয়ে সত্যিকার জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করছে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি কতটা কার্যকর?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থ বলা আসলে সমস্যাকে আড়াল করা।

শিক্ষকও কি দায়মুক্ত?

অবশ্যই নয়।

একজন শিক্ষকের হাতে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ থাকে। শিক্ষক যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করেন, শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত না করেন, দুর্বল শিক্ষার্থীকে আলাদা সহায়তা না দেন, তাহলে শুধু পরীক্ষার আগে কিছু পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।

তবে এটিও সত্য যে, সব দায় শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। একজন শিক্ষককে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি তাকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-উপকরণ, সম্মান এবং কার্যকর কর্মপরিবেশও দিতে হবে।

ভালো শিক্ষক চাই, কিন্তু ভালো শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থাও চাই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলও একটি আয়না

যে প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করে, সেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা খোঁজা যথেষ্ট নয়। সেই প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, প্রশাসন, শিক্ষক উপস্থিতি, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা দরকার।

একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ধারাবাহিকভাবে শতভাগ পাস করে, সেখান থেকেও শিক্ষা নেওয়া দরকার—কীভাবে তারা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করছে?

ফলাফল তাই শুধু শিক্ষার্থীর নয়; ফলাফল প্রতিষ্ঠানেরও।

অভিভাবকরাও কি দায়মুক্ত?

আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজে অনেক অভিভাবক সন্তানের ওপর এমন চাপ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষার আনন্দ হারিয়ে যায়।

‘কত পেলি?’—এই প্রশ্নটি হয়ে ওঠে প্রধান প্রশ্ন।

‘কী শিখলি?’—এই প্রশ্নটি অনেক সময় হারিয়ে যায়।

একটি শিশুকে যদি সারাক্ষণ অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়, GPA-5-কে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানানো হয় এবং ফেল করাকে জীবনের শেষ বলে মনে করানো হয়, তাহলে আমরা শিক্ষাকে উন্নত করছি না; বরং শিশুর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছি।

ফেল মানেই ব্যর্থতা নয়

একজন শিক্ষার্থী একটি পরীক্ষায় ফেল করতে পারে। কিন্তু সে জীবনে ফেল করেনি।

পরীক্ষার ফলাফল একজন মানুষের জীবনের একটি মুহূর্তের মূল্যায়ন; পুরো জীবনের নয়।

আজ যে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, আগামীকাল সে হয়তো একজন দক্ষ কারিগর হতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে, শিল্পী হতে পারে, কৃষিবিদ হতে পারে, প্রযুক্তিবিদ হতে পারে কিংবা সমাজের অসাধারণ একজন মানুষ হতে পারে।

তাই পরীক্ষার ফল দিয়ে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা ভয়ংকর ভুল।

আসল ফেল কোথায়?

আসল প্রশ্ন এখানেই।

যদি সাত লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়, তাহলে সাত লাখ পরিবার কষ্ট পাবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করা নয়।

রাষ্ট্রকে জানতে হবে—

কেন তারা ফেল করল?

কোন বিষয়ে বেশি ফেল করেছে?

কোন অঞ্চলে বেশি ফেল করেছে?

কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে বেশি ফেল করেছে?

কোন আর্থসামাজিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে আছে?

শিক্ষক-সংকটের সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কতটা?

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফলের সম্পর্ক কী?

প্রশ্নপত্রের ধরন কি শিক্ষার্থীদের বাস্তব শেখার সক্ষমতা যাচাই করছে?

এই তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া শিক্ষা সংস্কার সম্ভব নয়।

আমাদের দরকার ‘ফেল’ নয়, ‘ফেল করার কারণ’ বিশ্লেষণ

প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়—পাসের হার কত, ফেল কত, GPA-5 কত।

কিন্তু আরেকটি জাতীয় প্রতিবেদনও প্রকাশ হওয়া উচিত—

‘কেন ফেল করল এত শিক্ষার্থী?’

প্রতিটি বোর্ড, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ করা দরকার। যেখানে ফল খারাপ, সেখানে বিশেষ একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য remedial education বা পুনর্বাসনমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিকেও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

শেষ কথা: সাত লাখ নয়, সাত লাখ সম্ভাবনা

আমরা যদি সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর দিকে শুধু ‘ফেল করা ছাত্রছাত্রী’ হিসেবে তাকাই, তাহলে আমরা তাদের হারিয়ে ফেলব।

কিন্তু যদি তাদের দেখি সাত লাখ সম্ভাবনা হিসেবে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন দরজা খুলতে পারে।

তাদের ব্যর্থতার ভেতর থেকে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা খুঁজে বের করতে হবে।

কারণ একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে তার একটি বছর নষ্ট হতে পারে; কিন্তু একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যদি বারবার একই ভুল করে, তাহলে নষ্ট হয় একটি প্রজন্ম।

তাই আজ প্রয়োজন কাউকে অপমান করা নয়, কাউকে দোষারোপ করা নয়। প্রয়োজন আত্মসমালোচনা।

শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এ কথা বলা সহজ।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন তারা ফেল করল?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যদি দেখা যায়, তাদের ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান, পরিবার, নীতিনির্ধারক, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দায় রয়েছে—তাহলে আমাদের সৎভাবে স্বীকার করতেই হবে:

এই সাত লাখ শিক্ষার্থী একা ফেল করেনি; তাদের ফলাফলের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশও পরীক্ষায় বসেছিল। আর সেই পরীক্ষায় আমাদের সবারই নতুন করে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন হয়েছে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থী ফেল করেনি, ফেল করেছে বাংলাদেশ। পরীক্ষার ফলাফলের আয়নায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

শিক্ষার্থী ফেল করেনি, ফেল করেছে বাংলাদেশ। পরীক্ষার ফলাফলের আয়নায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

আপডেট সময় : ০১:৫৮:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

 

প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গভীর প্রশ্নের নাম। ২০২৬ সালের SSC ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মোট পাসের হার নেমে এসেছে ৬২.২৫ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.২ শতাংশীয় পয়েন্ট।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাত লাখ শিক্ষার্থী কি সত্যিই ফেল করেছে? নাকি তাদের ফলাফলের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষানীতি, শিক্ষকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সামাজিক বাস্তবতার ব্যর্থতাই প্রকাশ পেয়েছে?

আমরা যদি প্রতিবার ফল প্রকাশের পর শুধু বলি—‘এত শিক্ষার্থী ফেল করেছে’, তাহলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় একটি সংখ্যা বা একটি গ্রেড মাত্র। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে থাকে একটি পরিবার, একজন শিক্ষক, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি শিক্ষাব্যবস্থা এবং একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ।

একটি শিশুকে আমরা কী শেখাচ্ছি?

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানে—আমরা শিক্ষার্থীকে শেখাচ্ছি পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করতে হয়; কিন্তু সবসময় শেখাচ্ছি না কীভাবে শিখতে হয়।

শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি করা, প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো, বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে শেখানো। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক।

ফলে শিক্ষার্থী বই পড়ে পরীক্ষায় পাস করার জন্য। অভিভাবক সন্তানের ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। শিক্ষক ফলাফল নিয়ে চাপের মধ্যে থাকেন। প্রতিষ্ঠান ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতায় নামে। আর রাষ্ট্র হিসাব করে পাসের হার দিয়ে।

কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে যায়—

শিক্ষার্থী আসলে কতটা শিখল?

সাত লাখ শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় কার?

একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি বিষয়ে ফেল করলেই আমরা খুব সহজেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘অমনোযোগী’ কিংবা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু একটি শিশুর ব্যর্থতার কারণ কি এত সরল?

কোনো শিক্ষার্থী হয়তো পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটে পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারেনি। কেউ হয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছে। কেউ ভালো শিক্ষক পায়নি। কেউ হয়তো দীর্ঘদিন কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার চাপে নিজের মৌলিক শেখার ক্ষমতা হারিয়েছে।

আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, ল্যাবরেটরি ও পাঠাগারের অভাব কিংবা শিক্ষার পরিবেশের দুর্বলতাও শিক্ষার্থীর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করব কেন?

ফলাফল কমেছে—এটি কি শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা?

২০২৬ সালের SSC ফলাফলে পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে GPA-5 পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে।

এই পতনকে শুধুই ‘শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি’ বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু সহজ ব্যাখ্যা সবসময় সঠিক ব্যাখ্যা নয়।

প্রশ্ন করতে হবে—

শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ কেমন ছিল?

শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুত ছিলেন?

শিক্ষাপদ্ধতি কতটা কার্যকর ছিল?

পাঠ্যক্রম কি বয়স ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

পরীক্ষার প্রশ্ন কি মুখস্থনির্ভরতার বাইরে গিয়ে সত্যিকার জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করছে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি কতটা কার্যকর?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থ বলা আসলে সমস্যাকে আড়াল করা।

শিক্ষকও কি দায়মুক্ত?

অবশ্যই নয়।

একজন শিক্ষকের হাতে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ থাকে। শিক্ষক যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করেন, শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত না করেন, দুর্বল শিক্ষার্থীকে আলাদা সহায়তা না দেন, তাহলে শুধু পরীক্ষার আগে কিছু পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না।

তবে এটিও সত্য যে, সব দায় শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। একজন শিক্ষককে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি তাকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-উপকরণ, সম্মান এবং কার্যকর কর্মপরিবেশও দিতে হবে।

ভালো শিক্ষক চাই, কিন্তু ভালো শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থাও চাই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলও একটি আয়না

যে প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করে, সেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা খোঁজা যথেষ্ট নয়। সেই প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, প্রশাসন, শিক্ষক উপস্থিতি, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা দরকার।

একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ধারাবাহিকভাবে শতভাগ পাস করে, সেখান থেকেও শিক্ষা নেওয়া দরকার—কীভাবে তারা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করছে?

ফলাফল তাই শুধু শিক্ষার্থীর নয়; ফলাফল প্রতিষ্ঠানেরও।

অভিভাবকরাও কি দায়মুক্ত?

আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজে অনেক অভিভাবক সন্তানের ওপর এমন চাপ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষার আনন্দ হারিয়ে যায়।

‘কত পেলি?’—এই প্রশ্নটি হয়ে ওঠে প্রধান প্রশ্ন।

‘কী শিখলি?’—এই প্রশ্নটি অনেক সময় হারিয়ে যায়।

একটি শিশুকে যদি সারাক্ষণ অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়, GPA-5-কে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানানো হয় এবং ফেল করাকে জীবনের শেষ বলে মনে করানো হয়, তাহলে আমরা শিক্ষাকে উন্নত করছি না; বরং শিশুর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছি।

ফেল মানেই ব্যর্থতা নয়

একজন শিক্ষার্থী একটি পরীক্ষায় ফেল করতে পারে। কিন্তু সে জীবনে ফেল করেনি।

পরীক্ষার ফলাফল একজন মানুষের জীবনের একটি মুহূর্তের মূল্যায়ন; পুরো জীবনের নয়।

আজ যে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, আগামীকাল সে হয়তো একজন দক্ষ কারিগর হতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে, শিল্পী হতে পারে, কৃষিবিদ হতে পারে, প্রযুক্তিবিদ হতে পারে কিংবা সমাজের অসাধারণ একজন মানুষ হতে পারে।

তাই পরীক্ষার ফল দিয়ে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা ভয়ংকর ভুল।

আসল ফেল কোথায়?

আসল প্রশ্ন এখানেই।

যদি সাত লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়, তাহলে সাত লাখ পরিবার কষ্ট পাবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করা নয়।

রাষ্ট্রকে জানতে হবে—

কেন তারা ফেল করল?

কোন বিষয়ে বেশি ফেল করেছে?

কোন অঞ্চলে বেশি ফেল করেছে?

কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে বেশি ফেল করেছে?

কোন আর্থসামাজিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে আছে?

শিক্ষক-সংকটের সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক কতটা?

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফলের সম্পর্ক কী?

প্রশ্নপত্রের ধরন কি শিক্ষার্থীদের বাস্তব শেখার সক্ষমতা যাচাই করছে?

এই তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া শিক্ষা সংস্কার সম্ভব নয়।

আমাদের দরকার ‘ফেল’ নয়, ‘ফেল করার কারণ’ বিশ্লেষণ

প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়—পাসের হার কত, ফেল কত, GPA-5 কত।

কিন্তু আরেকটি জাতীয় প্রতিবেদনও প্রকাশ হওয়া উচিত—

‘কেন ফেল করল এত শিক্ষার্থী?’

প্রতিটি বোর্ড, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ করা দরকার। যেখানে ফল খারাপ, সেখানে বিশেষ একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য remedial education বা পুনর্বাসনমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিকেও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

শেষ কথা: সাত লাখ নয়, সাত লাখ সম্ভাবনা

আমরা যদি সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর দিকে শুধু ‘ফেল করা ছাত্রছাত্রী’ হিসেবে তাকাই, তাহলে আমরা তাদের হারিয়ে ফেলব।

কিন্তু যদি তাদের দেখি সাত লাখ সম্ভাবনা হিসেবে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন দরজা খুলতে পারে।

তাদের ব্যর্থতার ভেতর থেকে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা খুঁজে বের করতে হবে।

কারণ একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে তার একটি বছর নষ্ট হতে পারে; কিন্তু একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যদি বারবার একই ভুল করে, তাহলে নষ্ট হয় একটি প্রজন্ম।

তাই আজ প্রয়োজন কাউকে অপমান করা নয়, কাউকে দোষারোপ করা নয়। প্রয়োজন আত্মসমালোচনা।

শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এ কথা বলা সহজ।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন তারা ফেল করল?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যদি দেখা যায়, তাদের ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান, পরিবার, নীতিনির্ধারক, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দায় রয়েছে—তাহলে আমাদের সৎভাবে স্বীকার করতেই হবে:

এই সাত লাখ শিক্ষার্থী একা ফেল করেনি; তাদের ফলাফলের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশও পরীক্ষায় বসেছিল। আর সেই পরীক্ষায় আমাদের সবারই নতুন করে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন হয়েছে।