ঢাকা ০৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
আওয়ামী লীগ নেতা হানিফ ও জাসদ নেতা ইনুর আশির্বাদে চাকুরী ফিরে পাওয়া সেই জামানুর এখন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী! ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জাগরণ: রমনা কালীমন্দির বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অমর স্মারক। কাশিমপুর কারাগার থেকে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোনারগাঁয়ের মেঘনা টোল প্লাজা থেকে গ্রেফতার  গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়া প্রেস ক্লাবের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন আগামী ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটি কেন্দ্রীয় সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠান। রূপগঞ্জে গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনতাই পাঁচ বছর পর শুক্রবার দেশে ফেরার কথা ছিল, আবুধাবিতে ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল পটিয়ার পুলকের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে বাধার প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওয়ে মানববন্ধন নওগাঁয় ১৭জন শিক্ষকের ১০জন মাত্র পরীক্ষার্থী; তবুও পাস করলো না কেউ  কুমিল্লায় সাঁড়াশি অভিযানে আটক ৩৮৫, শ্রমিক অসন্তোষে উসকানির অভিযোগে গ্রেপ্তার ১

ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জাগরণ: রমনা কালীমন্দির বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অমর স্মারক।

 

একাত্তরের গণহত্যার ক্ষত বুকে ধারণ করে আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির। এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পুনর্নির্মাণ নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক।

ইতিহাস কখনো কেবল অতীতের বিবরণ নয়; ইতিহাস জাতির আত্মপরিচয়, বিবেক ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির সেই ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে মন্দিরের পবিত্র প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সাক্ষীস্থলে, আজ সেই মন্দিরেই আবার জ্বলে সন্ধ্যাপ্রদীপ, ধ্বনিত হয় প্রার্থনা। ধ্বংসের ভস্ম থেকে এই পুনর্জাগরণ বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও অদম্য মানবিক শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ঢাকার রমনা এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস বহু শতাব্দীর। জনশ্রুতি অনুসারে, প্রায় পাঁচশ বছর আগে গোপালগিরি নামে এক সন্ন্যাসী এখানে একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে হরিচরণ গিরি মূল মন্দির নির্মাণ করেন এবং ভাওয়ালের রানি বিলাসমণি দেবীর উদ্যোগে মন্দিরটির সংস্কার সাধিত হয়। একসময় মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া ছিল ঢাকার আকাশে এক পরিচিত দৃশ্য। ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি এটি ছিল ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ সেই পবিত্র ভূমিতে নেমে আসে ইতিহাসের এক ভয়াবহ অন্ধকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস অভিযানে রমনা কালীমন্দির ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সংঘটিত হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। ধ্বংস করা হয় প্রাচীন মন্দির ও তার স্থাপত্য। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রমনা গণহত্যা নামে পরিচিত।

রমনা কালীমন্দিরের ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনার ওপর আঘাত ছিল না; এটি ছিল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মানবিক মর্যাদার ওপর এক নির্মম আঘাত। যে মানুষগুলো মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের অপরাধ ছিল না কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, কোনো সামরিক প্রতিরোধ। তাঁরা ছিলেন সাধারণ মানুষ, যাঁদের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রমনা কালীমন্দিরের পুনর্নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিলম্ব আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—স্বাধীনতার চেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমরা কতটা আন্তরিক? একটি স্বাধীন দেশে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয় পুনর্নির্মাণের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা কখনোই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তার প্রতিফলন ঘটতে হবে রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসনের কার্যক্রম ও সামাজিক আচরণে।

অবশেষে ২০১৭ সালে রমনা কালীমন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ আর্থিক সহযোগিতায় মন্দিরটি নতুন রূপে নির্মিত হয়। ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় এসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ নবনির্মিত রমনা কালীমন্দির ও সংস্কার করা অংশের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মন্দিরের পুনর্জাগরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে।

তবে মন্দিরের পুনর্নির্মাণই আমাদের দায়িত্বের শেষ কথা নয়। যে হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচারও জরুরি। রমনা গণহত্যার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এই ইতিহাসের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইতিহাস বিস্মৃত হলে অন্যায়ের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বাড়ে।

রমনা কালীমন্দিরের পুনর্জাগরণ আমাদের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মানবিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আধিপত্যে নয়, বরং সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাও ছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

আজ যখন দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে, তখন রমনা কালীমন্দিরের ইতিহাস আমাদের নতুন করে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। ধর্মের নামে বিভেদ নয়, মানবতার ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, কোনো সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য—কোনোটিই স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।

রমনা কালীমন্দির আজ কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র তীর্থস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতীক। এর প্রতিটি ইট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ধ্বংসের মধ্যেও পুনর্জাগরণ সম্ভব, অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বলে ওঠে।

রমনা কালীমন্দিরের পুনর্জাগরণ তাই শুধু অতীতের ক্ষত নিরাময়ের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য এক গভীর বার্তা। যে বাংলাদেশে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; যে বাংলাদেশে মানুষের পরিচয় হবে তার মানবিকতা, আর নাগরিকের অধিকার হবে সমান ও অবিচ্ছেদ্য। সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই রমনা কালীমন্দিরের আত্মত্যাগ ও পুনর্জাগরণ প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগ নেতা হানিফ ও জাসদ নেতা ইনুর আশির্বাদে চাকুরী ফিরে পাওয়া সেই জামানুর এখন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী!

ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জাগরণ: রমনা কালীমন্দির বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অমর স্মারক।

আপডেট সময় : ০১:৩২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

 

একাত্তরের গণহত্যার ক্ষত বুকে ধারণ করে আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির। এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পুনর্নির্মাণ নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক।

ইতিহাস কখনো কেবল অতীতের বিবরণ নয়; ইতিহাস জাতির আত্মপরিচয়, বিবেক ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির সেই ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে মন্দিরের পবিত্র প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সাক্ষীস্থলে, আজ সেই মন্দিরেই আবার জ্বলে সন্ধ্যাপ্রদীপ, ধ্বনিত হয় প্রার্থনা। ধ্বংসের ভস্ম থেকে এই পুনর্জাগরণ বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও অদম্য মানবিক শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ঢাকার রমনা এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস বহু শতাব্দীর। জনশ্রুতি অনুসারে, প্রায় পাঁচশ বছর আগে গোপালগিরি নামে এক সন্ন্যাসী এখানে একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে হরিচরণ গিরি মূল মন্দির নির্মাণ করেন এবং ভাওয়ালের রানি বিলাসমণি দেবীর উদ্যোগে মন্দিরটির সংস্কার সাধিত হয়। একসময় মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া ছিল ঢাকার আকাশে এক পরিচিত দৃশ্য। ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি এটি ছিল ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ সেই পবিত্র ভূমিতে নেমে আসে ইতিহাসের এক ভয়াবহ অন্ধকার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস অভিযানে রমনা কালীমন্দির ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সংঘটিত হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। ধ্বংস করা হয় প্রাচীন মন্দির ও তার স্থাপত্য। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রমনা গণহত্যা নামে পরিচিত।

রমনা কালীমন্দিরের ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনার ওপর আঘাত ছিল না; এটি ছিল মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মানবিক মর্যাদার ওপর এক নির্মম আঘাত। যে মানুষগুলো মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের অপরাধ ছিল না কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, কোনো সামরিক প্রতিরোধ। তাঁরা ছিলেন সাধারণ মানুষ, যাঁদের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রমনা কালীমন্দিরের পুনর্নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিলম্ব আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—স্বাধীনতার চেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমরা কতটা আন্তরিক? একটি স্বাধীন দেশে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয় পুনর্নির্মাণের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা কখনোই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তার প্রতিফলন ঘটতে হবে রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসনের কার্যক্রম ও সামাজিক আচরণে।

অবশেষে ২০১৭ সালে রমনা কালীমন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ আর্থিক সহযোগিতায় মন্দিরটি নতুন রূপে নির্মিত হয়। ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় এসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ নবনির্মিত রমনা কালীমন্দির ও সংস্কার করা অংশের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মন্দিরের পুনর্জাগরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে।

তবে মন্দিরের পুনর্নির্মাণই আমাদের দায়িত্বের শেষ কথা নয়। যে হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচারও জরুরি। রমনা গণহত্যার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এই ইতিহাসের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইতিহাস বিস্মৃত হলে অন্যায়ের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বাড়ে।

রমনা কালীমন্দিরের পুনর্জাগরণ আমাদের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মানবিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আধিপত্যে নয়, বরং সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাও ছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

আজ যখন দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে, তখন রমনা কালীমন্দিরের ইতিহাস আমাদের নতুন করে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। ধর্মের নামে বিভেদ নয়, মানবতার ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, কোনো সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য—কোনোটিই স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।

রমনা কালীমন্দির আজ কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র তীর্থস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতীক। এর প্রতিটি ইট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ধ্বংসের মধ্যেও পুনর্জাগরণ সম্ভব, অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বলে ওঠে।

রমনা কালীমন্দিরের পুনর্জাগরণ তাই শুধু অতীতের ক্ষত নিরাময়ের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য এক গভীর বার্তা। যে বাংলাদেশে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার; যে বাংলাদেশে মানুষের পরিচয় হবে তার মানবিকতা, আর নাগরিকের অধিকার হবে সমান ও অবিচ্ছেদ্য। সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই রমনা কালীমন্দিরের আত্মত্যাগ ও পুনর্জাগরণ প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে উঠবে।