ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার আমতলীতে দুই দিনে ১৫৩ যানবাহন তল্লাশি, ট্রাফিক আইনে ২২ মামলা নেত্রকোনার পাহাড়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন মানেই নিত্যদিনের সংগ্রাম সুনামগঞ্জের হালুয়ারঘাট এলাকায় সাংবাদিকতার পরিচয়ে হাসান আলীর বিরুদ্ধে চাদাঁবাজির অভিযোগে এলাকাবাসির মানববন্ধন পঞ্চগড় জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে নবাগত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার শুভেচ্ছা বিনিময় খুলনার ফুলতলায় ১৯ বছরেও সংস্কার হয়নি প্রধান সড়ক, দুর্ভোগে ভদ্র পুকুর গ্রামের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে অর্ধসত্যের রাজনীতি বন্ধ হোক। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা যুবদলের বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে শহীদ ও বাপ্পির নেতৃত্বে শতশত নেতাকর্মী নিয়ে যোগদান সাবেক যুবলীগ নেতার পুত্র রেজা তাইমুর মালিককে ঘিরে নতুন আলোচনা, দায়িত্বে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গাজীপুর পিবিআইয়ের এসআই আলতাফের বিরুদ্ধে আইজিপির দপ্তর ও অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পিবিআই প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ
কয়েকজনের বিরোধিতা দিয়ে একটি সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না; ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বীকার করতে হবে সবার অবদান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে অর্ধসত্যের রাজনীতি বন্ধ হোক।

ইতিহাসকে রাজনৈতিক কিংবা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু যখন একটি জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তোলা হয়, তখন সেটি আর নিছক ইতিহাসচর্চার বিতর্ক থাকে না; তা হয়ে ওঠে সত্যের আংশিক ব্যবহার, স্মৃতির বিকৃতি এবং সামাজিক বিভাজন সৃষ্টির প্রচেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ককে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই বিচার করা প্রয়োজন।

আমাদের সম্পাদকীয় অবস্থান স্পষ্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় তৎকালীন কয়েকজন হিন্দু নেতার ভূমিকা ঐতিহাসিক সত্য হতে পারে; কিন্তু সেই সত্যের ভিত্তিতে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত নয়। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে হিন্দু শিক্ষাবিদদের অবদান অস্বীকার করাও সত্যের সঙ্গে প্রতারণা।

ইতিহাসের প্রশ্নে এই অবস্থান কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত নয়; এটি প্রমাণ, যুক্তি ও ন্যায়বোধের প্রতি দায়বদ্ধতা।

কয়েকজনের অবস্থানই একটি সম্প্রদায়ের অবস্থান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯১২ সালে। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের শিক্ষাবিস্তারের প্রশ্নে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সামনে আসে। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে কলকাতার কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও শিক্ষাবিদ আপত্তি জানান। তাঁদের মধ্যে হিন্দু নেতারাও ছিলেন। তাঁদের আপত্তির পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থ এবং বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের ভূমিকা ছিল।

এসব তথ্য ইতিহাসের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিরোধিতার দায় কি সমগ্র হিন্দু সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়?

একটি সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানকে সেই সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তির বিচারে ভ্রান্ত, ইতিহাসের বিচারে অসম্পূর্ণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিচারে বিপজ্জনক। কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের দায় তাঁর নিজের; কোনো সংগঠনের অবস্থানের দায় সেই সংগঠনের। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া এর বাইরে গিয়ে একটি গোটা সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।

এই একই নীতি অবশ্যই সব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিম সমাজের কোনো ব্যক্তির ভুলকে যেমন সব মুসলমানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি কোনো হিন্দু নেতার বিরোধিতাকে সব হিন্দুর অবস্থান বলে চালিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতিহাসের নামে সামষ্টিক দোষারোপ আসলে ইতিহাসের বিশ্লেষণ নয়; এটি ব্যক্তির অবস্থানকে সম্প্রদায়ের পরিচয়ে প্রতিস্থাপন করার কৌশল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কোনো একক সম্প্রদায়ের কৃতিত্ব নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের অবদান অনস্বীকার্য। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বিভিন্ন নেতা পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের উদ্যোগ ও দাবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথাযথভাবে তুলে ধরা অবশ্যই প্রয়োজন।

কিন্তু তাঁদের অবদান স্বীকার করার অর্থ কি অন্যদের অবদান অস্বীকার করা? নিশ্চয়ই নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯১২ সালে গঠিত নাথান কমিশনে আনন্দচন্দ্র রায় ও ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হিন্দু শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, গবেষণা, প্রশাসন ও বৌদ্ধিক বিকাশে হিন্দু শিক্ষাবিদদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়।

এই বাস্তবতা কোনো পক্ষের অবদান খর্ব করে না; বরং প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে আরও পূর্ণাঙ্গ করে।

জাতীয় ইতিহাসের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, একটি বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও ঐতিহাসিক শক্তি কাজ করতে পারে। কেউ উদ্যোগ নেন, কেউ পরিকল্পনা করেন, কেউ প্রশাসনিক কাঠামো গড়েন, কেউ শিক্ষকতা ও গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেন। তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা এক নয়, কিন্তু প্রত্যেকের অবদানই প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক কৃতিত্ব কিংবা অন্য একটি সম্প্রদায়ের সম্মিলিত বিরোধিতার গল্পে নামিয়ে আনা তাই গ্রহণযোগ্য নয়।

যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক ঐতিহ্য নির্মাণ করেছেন, তাঁদের পরিচয় ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং আরও বহু শিক্ষাবিদের অবদান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১৯২৪ সালের কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানবিষয়ক গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান ও বোসন কণার পরিচিতি বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে। রমেশচন্দ্র মজুমদারের ইতিহাসচর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে তাঁর ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অন্যান্য পণ্ডিতের গবেষণাও উপমহাদেশের সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই অবদানগুলো স্মরণ করার অর্থ কোনো ধর্মীয় পরিচয়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। বরং জাতীয় ইতিহাসের সম্পদকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া।

একজন বিজ্ঞানী যখন বিশ্বজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেন, তাঁর আবিষ্কার ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে মানবজাতির সম্পদে পরিণত হয়। একজন ইতিহাসবিদের গবেষণা কিংবা একজন ভাষাতাত্ত্বিকের আবিষ্কারও একইভাবে বৃহত্তর জ্ঞানজগতের অংশ হয়ে ওঠে।

তাহলে তাঁদের অবদানকে আজকের সাম্প্রদায়িক বিতর্কের সংকীর্ণ মাপকাঠিতে বিচার করা হবে কেন?

ইতিহাসের দলিল চাই, স্লোগান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে যাঁরা আলোচনা করেন, তাঁদের সবার প্রতিই আমাদের আহ্বান—দাবি তুলুন, কিন্তু দলিল দিন; প্রশ্ন তুলুন, কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে তুলুন। কোনো ব্যক্তির নামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, অর্থসাহায্য, জমি দান, প্রশাসনিক দায়িত্ব কিংবা বিশেষ কোনো ঐতিহাসিক ভূমিকা যুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক নথি ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা যাচাই করুন।

একইভাবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২৬ সালের ঢাকা সফর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত বিতর্কে তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে হলে সমকালীন বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথিকে ভিত্তি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর বা সংবর্ধনা পাওয়ার তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠার সময়কার বিতর্কে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

এখানে একটি নীতিগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো দাবি আমাদের পছন্দের হলেই তা সত্য হয়ে যায় না, আবার কোনো দাবি আমাদের অপছন্দের হলেই তা মিথ্যা হয়ে যায় না। সত্য নির্ধারিত হবে প্রমাণের মান, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যুক্তির সামঞ্জস্য দিয়ে।

যাঁরা ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁদেরও এই নীতিতে অবিচল থাকতে হবে। কারণ, অর্ধসত্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অযাচাইকৃত দাবি প্রতিষ্ঠা করলে ইতিহাসের কোনো উপকার হয় না।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের লাভ কার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তবুদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিকাশ, গণতান্ত্রিক চেতনা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যদি পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ানো হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ইতিহাসের বোধ নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সত্য জানার অধিকারও।

কোনো সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে অপরাধী প্রমাণ করার প্রবণতা অতীতের জটিল ঘটনাকে বর্তমানের পরিচয়-সংঘাতে টেনে আনে। এতে ইতিহাসের গভীরতা হারিয়ে যায়, বাড়ে বিদ্বেষের সরলীকরণ। অতীতের কোনো রাজনৈতিক বিরোধকে বর্তমানের সাম্প্রদায়িক শত্রুতায় রূপান্তর করা তাই দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়কার বিরোধিতার পেছনে যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা কাজ করেছিল, তা বুঝতে হলে সেই সময়ের ইতিহাস জানতে হবে। শুধু কয়েকটি নাম তুলে ধরে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করলে সেই বাস্তবতা বোঝা যায় না।

ইতিহাসের কাজ আদালতের মতো কোনো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; ইতিহাসের কাজ হলো ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা, প্রমাণের আলোকে দায় নির্ধারণ করা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

আমাদের সম্পাদকীয় অবস্থান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটুক তথ্যভিত্তিক গবেষণার মধ্য দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নথি, সমকালীন সংবাদপত্র, কমিশনের প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, নির্ভরযোগ্য জীবনী ও গবেষণাগ্রন্থের আলোকে প্রতিটি দাবি যাচাই করা হোক। যেখানে প্রমাণ আছে, সেখানে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হোক; যেখানে তথ্য অনিশ্চিত, সেখানে অনিশ্চয়তাও স্বীকার করা হোক।

মুসলিম নেতৃত্বের অবদান যথাযথ মর্যাদায় আলোচিত হোক। একই সঙ্গে হিন্দু শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতদের অবদানও স্বীকৃতি পাক। প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোও আড়াল না করে তাদের যথাযথ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা হোক।

আমরা কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষে ইতিহাসকে সাজাতে চাই না; চাই ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়াতে। আমরা কারও অবদান অস্বীকার করে অন্য কারও অবদান প্রতিষ্ঠা করতে চাই না; চাই প্রত্যেকের অবদানকে প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ মর্যাদা দিতে।

কারণ, ইতিহাসের সত্য কারও একার সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের সত্যকে যত বেশি নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা যায়, জাতির আত্মপরিচয় তত বেশি সুদৃঢ় হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সম্মিলিত ঐতিহ্যের অংশ। এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দোষারোপ নয়, প্রয়োজন গভীর গবেষণা, যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হিন্দু বনাম মুসলমানের নয়; প্রশ্নটি সত্য বনাম অর্ধসত্যের। প্রশ্নটি কোনো সম্প্রদায়কে জয়ী ঘোষণা করার নয়; প্রশ্নটি ইতিহাসকে তার পূর্ণতা ফিরিয়ে দেওয়ার।

যে ইতিহাসে একজনের অবদান স্বীকার করতে অন্যজনকে অস্বীকার করতে হয়, সে ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আর যে ইতিহাসে সত্যকে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং প্রত্যেকের ন্যায্য অবদানকে মর্যাদা দেওয়া হয়, সেই ইতিহাসই একটি জাতিকে বিভক্ত নয়, পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে আমাদের চূড়ান্ত অবস্থান হওয়া উচিত সেই পরিণত, অসাম্প্রদায়িক ও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবোধের পক্ষেই।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার

কয়েকজনের বিরোধিতা দিয়ে একটি সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না; ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বীকার করতে হবে সবার অবদান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে অর্ধসত্যের রাজনীতি বন্ধ হোক।

আপডেট সময় : ১০:২৮:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ইতিহাসকে রাজনৈতিক কিংবা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু যখন একটি জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তোলা হয়, তখন সেটি আর নিছক ইতিহাসচর্চার বিতর্ক থাকে না; তা হয়ে ওঠে সত্যের আংশিক ব্যবহার, স্মৃতির বিকৃতি এবং সামাজিক বিভাজন সৃষ্টির প্রচেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্ককে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই বিচার করা প্রয়োজন।

আমাদের সম্পাদকীয় অবস্থান স্পষ্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় তৎকালীন কয়েকজন হিন্দু নেতার ভূমিকা ঐতিহাসিক সত্য হতে পারে; কিন্তু সেই সত্যের ভিত্তিতে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত নয়। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে হিন্দু শিক্ষাবিদদের অবদান অস্বীকার করাও সত্যের সঙ্গে প্রতারণা।

ইতিহাসের প্রশ্নে এই অবস্থান কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত নয়; এটি প্রমাণ, যুক্তি ও ন্যায়বোধের প্রতি দায়বদ্ধতা।

কয়েকজনের অবস্থানই একটি সম্প্রদায়ের অবস্থান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯১২ সালে। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের শিক্ষাবিস্তারের প্রশ্নে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সামনে আসে। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে কলকাতার কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও শিক্ষাবিদ আপত্তি জানান। তাঁদের মধ্যে হিন্দু নেতারাও ছিলেন। তাঁদের আপত্তির পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থ এবং বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের ভূমিকা ছিল।

এসব তথ্য ইতিহাসের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিরোধিতার দায় কি সমগ্র হিন্দু সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়?

একটি সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানকে সেই সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তির বিচারে ভ্রান্ত, ইতিহাসের বিচারে অসম্পূর্ণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিচারে বিপজ্জনক। কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের দায় তাঁর নিজের; কোনো সংগঠনের অবস্থানের দায় সেই সংগঠনের। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া এর বাইরে গিয়ে একটি গোটা সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।

এই একই নীতি অবশ্যই সব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিম সমাজের কোনো ব্যক্তির ভুলকে যেমন সব মুসলমানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি কোনো হিন্দু নেতার বিরোধিতাকে সব হিন্দুর অবস্থান বলে চালিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতিহাসের নামে সামষ্টিক দোষারোপ আসলে ইতিহাসের বিশ্লেষণ নয়; এটি ব্যক্তির অবস্থানকে সম্প্রদায়ের পরিচয়ে প্রতিস্থাপন করার কৌশল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কোনো একক সম্প্রদায়ের কৃতিত্ব নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের অবদান অনস্বীকার্য। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বিভিন্ন নেতা পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের উদ্যোগ ও দাবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথাযথভাবে তুলে ধরা অবশ্যই প্রয়োজন।

কিন্তু তাঁদের অবদান স্বীকার করার অর্থ কি অন্যদের অবদান অস্বীকার করা? নিশ্চয়ই নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯১২ সালে গঠিত নাথান কমিশনে আনন্দচন্দ্র রায় ও ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হিন্দু শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, গবেষণা, প্রশাসন ও বৌদ্ধিক বিকাশে হিন্দু শিক্ষাবিদদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়।

এই বাস্তবতা কোনো পক্ষের অবদান খর্ব করে না; বরং প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে আরও পূর্ণাঙ্গ করে।

জাতীয় ইতিহাসের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, একটি বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও ঐতিহাসিক শক্তি কাজ করতে পারে। কেউ উদ্যোগ নেন, কেউ পরিকল্পনা করেন, কেউ প্রশাসনিক কাঠামো গড়েন, কেউ শিক্ষকতা ও গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেন। তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা এক নয়, কিন্তু প্রত্যেকের অবদানই প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে কোনো একটি সম্প্রদায়ের একক কৃতিত্ব কিংবা অন্য একটি সম্প্রদায়ের সম্মিলিত বিরোধিতার গল্পে নামিয়ে আনা তাই গ্রহণযোগ্য নয়।

যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক ঐতিহ্য নির্মাণ করেছেন, তাঁদের পরিচয় ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং আরও বহু শিক্ষাবিদের অবদান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১৯২৪ সালের কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানবিষয়ক গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান ও বোসন কণার পরিচিতি বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে। রমেশচন্দ্র মজুমদারের ইতিহাসচর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে তাঁর ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অন্যান্য পণ্ডিতের গবেষণাও উপমহাদেশের সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই অবদানগুলো স্মরণ করার অর্থ কোনো ধর্মীয় পরিচয়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। বরং জাতীয় ইতিহাসের সম্পদকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া।

একজন বিজ্ঞানী যখন বিশ্বজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেন, তাঁর আবিষ্কার ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে মানবজাতির সম্পদে পরিণত হয়। একজন ইতিহাসবিদের গবেষণা কিংবা একজন ভাষাতাত্ত্বিকের আবিষ্কারও একইভাবে বৃহত্তর জ্ঞানজগতের অংশ হয়ে ওঠে।

তাহলে তাঁদের অবদানকে আজকের সাম্প্রদায়িক বিতর্কের সংকীর্ণ মাপকাঠিতে বিচার করা হবে কেন?

ইতিহাসের দলিল চাই, স্লোগান নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে যাঁরা আলোচনা করেন, তাঁদের সবার প্রতিই আমাদের আহ্বান—দাবি তুলুন, কিন্তু দলিল দিন; প্রশ্ন তুলুন, কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে তুলুন। কোনো ব্যক্তির নামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, অর্থসাহায্য, জমি দান, প্রশাসনিক দায়িত্ব কিংবা বিশেষ কোনো ঐতিহাসিক ভূমিকা যুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক নথি ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা যাচাই করুন।

একইভাবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২৬ সালের ঢাকা সফর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত বিতর্কে তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে হলে সমকালীন বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথিকে ভিত্তি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সফর বা সংবর্ধনা পাওয়ার তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠার সময়কার বিতর্কে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

এখানে একটি নীতিগত পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো দাবি আমাদের পছন্দের হলেই তা সত্য হয়ে যায় না, আবার কোনো দাবি আমাদের অপছন্দের হলেই তা মিথ্যা হয়ে যায় না। সত্য নির্ধারিত হবে প্রমাণের মান, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যুক্তির সামঞ্জস্য দিয়ে।

যাঁরা ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁদেরও এই নীতিতে অবিচল থাকতে হবে। কারণ, অর্ধসত্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অযাচাইকৃত দাবি প্রতিষ্ঠা করলে ইতিহাসের কোনো উপকার হয় না।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের লাভ কার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তবুদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিকাশ, গণতান্ত্রিক চেতনা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যদি পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ানো হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ইতিহাসের বোধ নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সত্য জানার অধিকারও।

কোনো সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে অপরাধী প্রমাণ করার প্রবণতা অতীতের জটিল ঘটনাকে বর্তমানের পরিচয়-সংঘাতে টেনে আনে। এতে ইতিহাসের গভীরতা হারিয়ে যায়, বাড়ে বিদ্বেষের সরলীকরণ। অতীতের কোনো রাজনৈতিক বিরোধকে বর্তমানের সাম্প্রদায়িক শত্রুতায় রূপান্তর করা তাই দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়কার বিরোধিতার পেছনে যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা কাজ করেছিল, তা বুঝতে হলে সেই সময়ের ইতিহাস জানতে হবে। শুধু কয়েকটি নাম তুলে ধরে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করলে সেই বাস্তবতা বোঝা যায় না।

ইতিহাসের কাজ আদালতের মতো কোনো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; ইতিহাসের কাজ হলো ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা, প্রমাণের আলোকে দায় নির্ধারণ করা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

আমাদের সম্পাদকীয় অবস্থান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটুক তথ্যভিত্তিক গবেষণার মধ্য দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নথি, সমকালীন সংবাদপত্র, কমিশনের প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, নির্ভরযোগ্য জীবনী ও গবেষণাগ্রন্থের আলোকে প্রতিটি দাবি যাচাই করা হোক। যেখানে প্রমাণ আছে, সেখানে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হোক; যেখানে তথ্য অনিশ্চিত, সেখানে অনিশ্চয়তাও স্বীকার করা হোক।

মুসলিম নেতৃত্বের অবদান যথাযথ মর্যাদায় আলোচিত হোক। একই সঙ্গে হিন্দু শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতদের অবদানও স্বীকৃতি পাক। প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোও আড়াল না করে তাদের যথাযথ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা হোক।

আমরা কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষে ইতিহাসকে সাজাতে চাই না; চাই ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়াতে। আমরা কারও অবদান অস্বীকার করে অন্য কারও অবদান প্রতিষ্ঠা করতে চাই না; চাই প্রত্যেকের অবদানকে প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ মর্যাদা দিতে।

কারণ, ইতিহাসের সত্য কারও একার সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের সত্যকে যত বেশি নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা যায়, জাতির আত্মপরিচয় তত বেশি সুদৃঢ় হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সম্মিলিত ঐতিহ্যের অংশ। এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দোষারোপ নয়, প্রয়োজন গভীর গবেষণা, যুক্তিনিষ্ঠ বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হিন্দু বনাম মুসলমানের নয়; প্রশ্নটি সত্য বনাম অর্ধসত্যের। প্রশ্নটি কোনো সম্প্রদায়কে জয়ী ঘোষণা করার নয়; প্রশ্নটি ইতিহাসকে তার পূর্ণতা ফিরিয়ে দেওয়ার।

যে ইতিহাসে একজনের অবদান স্বীকার করতে অন্যজনকে অস্বীকার করতে হয়, সে ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আর যে ইতিহাসে সত্যকে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং প্রত্যেকের ন্যায্য অবদানকে মর্যাদা দেওয়া হয়, সেই ইতিহাসই একটি জাতিকে বিভক্ত নয়, পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে আমাদের চূড়ান্ত অবস্থান হওয়া উচিত সেই পরিণত, অসাম্প্রদায়িক ও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবোধের পক্ষেই।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।