প্রত্যেক মানুষের একটি শৈশব থাকে।শৈশবের স্মৃতিও থাকে।তবে শৈশবের স্মৃতি যতটা মনে পড়ে কৈশোর স্মৃতি তার চেয়ে বেশী মনে পড়ে। তারপরও এই কৈশোর স্মৃতিকেই আমরা শৈশব স্মৃতি বলেই চালিয়ে দিই।
আমরা বলি স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি কাকে বলে।আসুন একবার ভেবে দেখি স্মৃতি কাকে বলে।স্মৃতি যা মস্তিষ্কের ক্যানভাসে স্থায়ী একটি আসন নিয়ে বসে।মন চাইলেই তার চিত্র চোখের সামনে অদৃশ্য এক সুখ দুখের অনুভূতি হয়ে সামনে দাঁড়ায়। স্মৃতি ও স্মরণ এক নয়। স্মরন হোল স্মৃতির স্টোর যা মস্তিষ্ক থেকে টেনে হেচড়ে সামনে এনে দাড় করাতে হয়।
মানব জীবন একেবারে ছোট নয়।কারও স্মৃতি ক্ষনে ক্ষনে ভেসে ওঠে আবার কারও স্মৃতি স্মরণ করতে হয়। আমার শৈশবের ঈদের স্মৃতি স্মরণ করতে হয় না। স্মৃতির ক্যানভাসে এমনিতেই ভেসে ওঠে। তবে শৈশবে ঈদের আগমন ছিল মধুমতীতে বর্ষায় প্রবেশ করা প্রথম জলের প্রবাহের মত।
আমরা তিন বোন দুই ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার বড়। সব ঈদেই সবার নতুন কাপড় পরে ঈদের মাঠে যাওয়া হতো না।প্রাইমারিতে পড়াকালীন রোজার ঈদে নতুন কাপড় পেয়েছি।তখন আজকের মত রেডিমেড কাপড়ের প্রতি এত ঝোক ছিল না। বিশেষ করে গ্রামে। নতুন কাপড় মানেই দর্জির হাতের স্পর্শ। রেডিমেড কাপড়কে হাকচা কাপড় বলত।আর এ কাপড়ের দোকান কে হাকচা দোকান বলত।রেডিমেড শব্দটি গ্রামে অনেক পরে প্রচলিত।
কয়েকটা রোজা থাকতেই আব্বা বাবুখালী বাজারে দর্জির দোকানে নিয়ে যেতেন নতুন পাজামা পাঞ্জাবির জন্য।সে সময় কয়েকজন দর্জি ছিল এ বাজারে। সবার নাম মনে নেই।তবে যব্বার দর্জির নাম ভাল মনে আছে।তিনি মারা গেলে তার ছেলে আকতারও দর্জিগিরি করেছে।বাবুখালী বাজারে তখন তিন চারটে টিনের ঘর ছিল। আর সব খড়ের চৌচালা এবং এক চালা ঘর ছিল।এই দর্জিরা আবার কাটা কাপড়ের দোকানের সাথে যুক্ত থাকতো। আমি যে গল্পটা করছি তা স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ের।
অনেক সময় আমার নতুন কাপড় কামারখালী গোলাপদি দর্জির নিকট থেকেও বানানো হতো।স্থানীয়রা রোজার সেহেরী শুরু করতেন ডুমুরশিয়া জয়নাল মৌলভী সাহেবের ঘন্টা ধ্বনি বা কামারখালী ভোরের ট্রেনের আগমনী হুইসেল শুনে। সে সময় এ দুটি শব্দ খুব ভালই শুনা যেত। ইফতার হতো মোল্লার মসজিদে আযানের ধ্বনিতে।আবার আযানের ধ্বনি শুনতে না পারলে মুরগী ঘরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ইফতার করতেন। ইফতারকে বলতেন পানি মুখি আর সেহেরি খাওয়াকে সর্গাই খাওয়া। এ সময় ঘড়ির সময় ধরে ইফতার বা সেহেরির কোন সুযোগ ছিলনা। রেডিও, টেলিভিশনও যথেচ্ছা ছিলনা।
ঈদের চাঁদ দেখার জন্য আমরা বাড়ির টিনের ঘরের চালায়,কেউবা আবার ফাঁকা মাঠে, কেউবা আবার নারকেল গাছের মাথায় উঠে সবার আগে দেখার ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করতাম। তা ছাড়াও ঈদের চাঁদ দেখা সুন্নাত বলে মুরব্বিরা আমাদের আগ্রহও জন্মাতেন। যে প্রথম দেখতে পেত সে চিৎকার করে উঠত।তাকে আবার সবাই অনুরোধ করত দেখানোর জন্য।সে আংগুল দিয়ে “ঐ যে একটা তারা দেখা যায় ওর একটু ডান পাশদিয়ে কাস্তের মত।” কেউ যদি বলত, “না দেখতে পাচ্ছি নে” তার বেশী কথা শুনতে হত। কত এই বেশী কথা না শুনার জন্য না দেখেও লাফ মেরে বলেছি, “হ্যা, হ্যা দেখেছি, এবার চাঁদটা একটু উত্তরে কাত।” চাঁদ দেখা দিলে আযান দিতে হয় কিন্তু যে চাঁদ দেখেছে সে আযান জানেনা।আবার যে আযান দিতে পারে সে চাঁদ দেখতে পায় নাই। এই টানাটানিতে একসময় চাঁদ সকলেরই দৃষ্টি গোচরে আসত।আযানও হতো। এই দিনের ইফতার শুরু হতো চাঁদ দেখার সাথে সাথে।
চাঁদ কাত হয়ে উঠেছে শুনলে নানির মনটা খারাপ হয়ে যেত।”বিপদ আসছে ” বলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। এটি ছিল তার ধারণা। কিন্তু এটি যে আলোর খেলা তিনি তা বুঝতেন না।
মেঘের জন্য কোন কারণে ঈদের চাঁদ দেখা না গেলে রেডিও যার বাড়ি ছিল তার মর্যাদা বেড়ে যেত।
সকালে ঘুম থেকে উঠলেই সম বয়সিদের মধ্যে ঈদের মাঠে যার যার পরিকল্পনার কথা ব্যাক্ত করা হতো। তারমধ্যে বেশির ভাগই ছিল মার্বেল খেলা।এই ইচ্ছেগুলো বলার অভিব্যক্তিই ছিল আলাদা ।মুরব্বিদের সাথে গোসল শেষে বাড়ি এলে দেখতাম মা দুই রকম খির এবং শিমাই রেঁধে ফেলেছেন।সে সময় শিমাইয়ের প্রচলন সবে গ্রাম পর্যায়ে শুরু। খির গুড় দিয়েই রান্না হতো।খেজুরের এবং আখের গুড় দিয়ে। চিনি দিয়ে কেবল শিমাই রান্না হতো।
নতুন পাজামা পাঞ্জাবি পরে ঈদের মাঠে যাওয়ার অনুভূতি একটু আলাদা।ঠিক ঈদের আলাদা দিবসের মত। ঈদের মাঠ ছিল বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে সুলতানসি গ্রামে।এখন যাকে বাবুখালী ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান বলে।
আব্বা পাঞ্জাবির পকেটে টাকা দিয়ে কোথায় কিভাবে খরচ করতে হবে বলে দিতেন।
পাজামা পাঞ্জাবি পরে মাঝে মধ্যে সান গ্লাসটাও চোখে লাগিয়ে দিতাম। রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে কেউ কেউ বলতেন,”মোনায়েম খা যাচ্ছে”। পাকিস্তান আমল তেল মারার একটা পদ্ধতি আর কি।
কৈশোর শেষ হয়নি আবার যৌবনেও পা রাখিনি এরই মাঝখানে এসে ঈদের দিনের সময় কাটানোর আনন্দে যোগ হলো সিনেমার পত্রিকা। চিত্রালী, পূর্বানীই আমাদের পরিচিত সিনেমার পত্রিকা ছিল।ঈদের দিনে সময় কাটাতে মাগুরা বুক সাপ্লাই,বই ঘর থেকে এ সকল পত্রিকা সংগ্রহ করতাম। এই বয়সে এসে স্কুলের বন্ধুদের বাড়ি বেড়ানোর আগ্রহ দেখা দিল। সিনেমার পত্রিকা পড়ে আর বন্ধুদের বাড়িতে ঘুরে এ সময়ে এ দিনটির আনন্দ উপভোগ করার মানসিকতা তৈরি হলো।
এখন অনেক সময় পার হয়েছে।বুড়ো হয়েছি,অনেক কিশোরকে দেখি ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখার জন্য কোন ব্যস্ততা নেই।আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটা দেখার ব্যস্ততার চেয়ে ফোন দেখায় ব্যাস্ত। এদের মধ্যে সুন্নাত অর্জনের কোন ব্যাতিব্যস্ততা নেই।এক সময় চাঁদ এসে ভেসে ওঠে ফোনে,হেসে বলে কালই ঈদ!
রোজা আসে, আসে ঈদ,ঈদের চাঁদ ওঠে। কিন্তু চাঁদ দেখার এই সুন্নতটুকু অর্জনে দল বেধে ফাঁকা মাঠে বা উঁচু গাছেও আর কেউ ওঠে না। কিন্তু সেই দিনের ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ আজও মনের কোনায় জেগে ওঠে।হই নষ্টালজিক, খুঁজে ফিরি অতীত। ক্রমান্বয়ে ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে যাচ্ছে নগরায়ন জীবনে।
অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলম 























