এমন একটা সময় ছিল যখন পন্য বিনিময় করে মানুষ দৈনন্দিন চাহিদা পূরন করতো। বিনিময় প্রথায় বিনিময়কারীর মধ্যে লাভ-ক্ষতির ব্যবধ্যান দেখা দেয়। লাভ ক্ষতির এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আবিষ্কার। আর এই মূল্য নির্ধারণে কেনা বেচার জন্য হাট বাজার গড়ে ওঠে। এই হাট বাজার গড়ে ওঠে কখনো রাজা,জমিদার বা সরকারের প্রচেষ্টায়। কখনো আবার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়।
বাবুখালী ইউনিয়নে বাবুখালি, হাট বাড়িয়া, সেনের হাট, রাজার হাট,ঠাকুরের হাট অতি প্রাচীন কয়েকটি হাট। বাবুখালী, হাট বাড়িয়া হাট ইংরেজ নীলকরদের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত। ডুমুরশিয়া সেনের হাট এবং চূড়ারগাতি রাজার হাট গড়ে ওঠে সেন জমিদার এবং নলডাংগার (কালিগঞ্জ) জমিদার রাজা তুষার রায়ের প্রচেষ্টায়। জমিদার তার প্রজাদের পণ্য কেনা বেচার জন্য যাতে অন্য জায়গায় না যেতে হয় তার জন্য নিজ এলাকায় হাট বসিয়ে দিতেন। এতে রাজস্বও আসত এবং জমিদারদের ব্যাক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের মংগলের জন্য, জন স্বার্থে কিছু সাধারণ মানুষ নিজের জমি দান করেও হাট বাজার স্থাপন করে দিতেন।ঠাকুরের হাট তেমনই একটি হাট। ফলে অন্যান্য হাটের স্থাপিত সময় কাল অনুমান করা গেলেও ঠাকুরের হাট স্থাপনের সময় কাল নির্ধারণ করা মুষ্কিল। তবে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় কাওয়ালি পাড়ার বংকিম ঠাকুর ৪২ শতক জমি দান করে হাটটি স্থাপন করেন, স্থানীয় জনগণের পণ্য বেচা কেনার দূর্দশা লাঘবের জন্য। আড়পাড়া গ্রামের এই জায়গাটা তখন উঁচু জায়গা ছিল।সাধারণত বর্ষা,বন্যায় এখানে তেমন পানি উঠত না। ফলে হাটের জন্য এ জায়গাটিই উত্তম ছিল। কামারখালী হাটের বিপরীতে শুক্রবার ও সোমবার সপ্তাহে হাট বসে।
বংকিম বাবু সমসাময়িক সময়ে ফাঁকা মাঠের মধ্যে এই হাটে মানুষের ছায়া দানের জন্য একটি অশত্থ গাছও রোপণ করেছিলেন। গাছটি এখন মহিরুহে পরিনত হয়েছে। কাওয়ালি পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা অরুন সিংহ বলেন, “অশত্থ গাছটির বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর হবে।”তাহলে ঠাকুরের হাটের বয়সও ওরকমই হবে।
বংকিম ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত হাট বিধায় আড়পাড়া গ্রামে হলেও ঠাকুরের হাট নামেই পরিচিত এবং সরকারি রেকর্ড ভুক্ত।
এ হাটে সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার বিকালে হাট এবং প্রায় দুইশ সদস্য এ বাজারে ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে যুক্ত। এক সময়ের ফাঁকা বিরানভূমির মধ্যের এ হাটে স্থায়ী অস্থায়ী কোন ঘরই ছিল না। হাটের সময়ে ঝড় বৃষ্টি হলে আশ্রয় নেয়ার মত আশে পাশে কোন বাড়ি ঘরও ছিল না। স্থানীয় উঠতি বয়সের ছেলেরা কুইজ দিত, ” বলতো বাংলাদেশের কোন হাটে কোন ঘর নাই”? তার উত্তর ছিল ঠাকুরের হাট।
রাতে অশত্থ গাছে দূর গ্রাম থেকে ভূতের নাচন দেখতে পেত।তাই ভয়ে কেউ এ হাটের আশে পাশে বাড়ি ঘরও বানাতো না। এ হাটের আশে পাশে বাড়ি ঘর ছিল না বিধায় এক সময় এ জায়গা ডাকাত,ছিনতাই কারীর অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছিল।
হাটটি এখন সরকারের তত্বাবধানে আছে।এ হাট থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আসে। বাংলা সনের শেষের দিকে প্রতি বছর নিলাম হয়। খোলা ডাকের মাধ্যমে হাটটি ইজারা দেয়া হয়।
স্থানীয় কিছু ঘৃন্য মানসিকতার লোক ঠাকুরের হাট নামটি পরিবর্তন করে আড়পাড়া বাজার নামকরণের চেষ্টা করেছে।কিন্তু তা কি হয়? প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির গ্রামীণ জীবন জীবিকার অচ্ছেদ্য মেলবন্ধন। যেখানে জাতি, ধর্ম,বর্ণ, মিশে একাকার।
সৈয়দ রবিউল ইসলাম - সাবেক অধ্যক্ষ 























