গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
বদলি বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এবার উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী। তাদের দাবি, এটি কেবল অভিযোগভিত্তিক সংবাদ নয়; বরং প্রধান প্রকৌশলীর পদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ এবং একটি সুপরিকল্পিত পদ দখলের কৌশলের অংশ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, প্রশাসনিক বাস্তবতা কিংবা সংশ্লিষ্টদের অবস্থান তুলে ধরা হয়নি। এতে একতরফা উপস্থাপনার মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইস্কান্দার আলীর বদলিকে ঘিরে প্রতিবেদনে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের বক্তব্য, সাবেক সরকারের সময় তিনি পিএনবিতে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে তাকে ময়মনসিংহে পদায়ন করা হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল না। বরং তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন তার ঘনিষ্ঠরা।
সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাকে আলোচিত বা লাভজনক কোনো পদে নয়, তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ইএম-৬ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে তাকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা তথ্যভিত্তিক নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে আরেকটি আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলামকে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসানোর লক্ষ্যে একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে। সেই তৎপরতার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) বদরুল আলম খানের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, বদরুল আলম খান দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাদের ভাষ্য, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে পূর্বের সমন্বয়ের সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ার পর থেকেই নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে এবং সেই সুযোগে নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। তাদের মতে, ‘সাংবাদিককে বাস্টার্ড বললেন গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী’—এ ধরনের শিরোনাম অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং তা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরির ঝুঁকি বহন করে। তাদের অভিযোগ, এমন উপস্থাপনার মাধ্যমে পুরো সাংবাদিক সমাজকে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার একটি প্রচেষ্টা থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তথ্য, নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা উচিত।
অন্যদিকে অভিযোগের বিপরীত দিক বা সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপট যাচাই না করলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। তাদের আরও দাবি, প্রতিবেদনে যেসব বদলি, নিয়োগ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব কিংবা প্রভাব বিস্তারের লড়াই চলতে থাকে, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পড়বে।
তাদের আহ্বান, প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা বদলি বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করা হোক। একইভাবে অভিযোগের আড়ালে যদি কোনো পরিকল্পিত অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র বা পদ দখলের চেষ্টা থেকে থাকে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ—উভয় পক্ষের বিষয়েই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়াই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। (প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব দাবির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।)
নিজস্ব প্রতিবেদক 























