ঢাকা ০৩:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ। ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা? ১৫ আগস্ট: গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া। হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ৭ মাসে ৪৫২ জন আটক, খুশি সচেতন মহল। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। যশোরের বাঘারপাড়ায় পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ গ্রাম। রূপগঞ্জে দেবরের হামলায় ভাবী নিহত গ্রেফতার ৩। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পেলেন ইউপি সদস্য। ১৭ দেশে ২৫ বার ভ্রমণ, ১৭ বছর পেকুতে—গণপূর্ত প্রকৌশলী কাজী ফিরোজকে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়।
টেস্ট পরীক্ষার অনিয়ম, কৃত্রিম পাস এবং আজকের ভয়াবহ ফলাফল—একটি নির্মম আত্মজিজ্ঞাসা।

ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা?

 

ফলাফল প্রকাশের পর আমরা যখন দেখি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর হাতে ‘ফেল’ শব্দটি, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। কারও চোখে জল, কারও মুখে হতাশা, কোথাও বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস—কত স্বপ্ন যে একটি ফলাফলের কাগজে এসে ভেঙে পড়ে!

কিন্তু আজ একটি কঠিন প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে—

এই যে এত শিক্ষার্থী ফেল করল, তারা কি সত্যিই একা ফেল করেছে? নাকি তাদের সঙ্গে ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার একটি অংশ?

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো—যেসব শিক্ষার্থী টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজনকে প্রকৃত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? আর কতজনকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার পরীক্ষা নিয়ে কিংবা নম্বরের কারসাজির মাধ্যমে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যোগ্য দেখানো হয়েছিল?

প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু অস্বস্তিকর বলেই এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সেই সতর্কবার্তা কি আমরা ভুলে গেছি?

আপনার দেওয়া দলিলটি এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ২০১৮ সালের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মিথ্যা প্রত্যয়ন দিয়ে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষার খাতা সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো নমুনা পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছিল।

অর্থাৎ সমস্যাটি আজকের নয়।

প্রায় এক দশক আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।

তবু যদি আজও কোথাও সেই একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে প্রশ্ন শুধু কয়েকজন শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে নিয়ে নয়—প্রশ্ন আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়েও।

যে টেস্ট পরীক্ষা সতর্ক করার কথা, সেটিই যদি প্রতারণার হাতিয়ার হয়!

টেস্ট পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জন্য শাস্তি নয়; এটি সতর্কসংকেত।

টেস্ট পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী ফেল করলে তাকে বলা উচিত—

‘তোমার প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়। আরও পড়ো। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।’

কিন্তু যদি বলা হয়—

‘চিন্তা করো না, তোমাকে কোনোভাবে পাস করিয়ে দেওয়া হবে।’

তাহলে সেদিন শুধু একটি ফলাফল বদলায় না; বদলে যায় একজন শিক্ষার্থীর মানসিকতা।

সে শেখে—পরিশ্রমের চেয়ে ব্যবস্থা বড়।

সে শেখে—যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড়।

সে শেখে—ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়েও কাগজে সফল হওয়া যায়।

এই শিক্ষা কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা নেই; কিন্তু এমন অনিয়মের মাধ্যমে আমরা অজান্তেই শিক্ষার্থীদের সেই শিক্ষাই দিয়ে দিই।

দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার পরীক্ষা—তারপর সরাসরি পাবলিক পরীক্ষায়!

অভিযোগ যদি সত্য হয় যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, তারপর তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় শিক্ষার্থীর দুর্বলতা দূর করা, তাকে শেখানো এবং প্রস্তুত করা—তাহলে সেটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় শুধু ‘ফেল করা শিক্ষার্থীকে পাস দেখানো’, তাহলে সেটি শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতারণা।

একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়া তাকে সাহায্য করা নয়।

তাকে আরও বড় পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেওয়া।

আজ টেস্টে তাকে কোনোভাবে পাস করানো হলো, কাল পাবলিক পরীক্ষায় সে ফেল করল। তখন তার পরিবারকে কে সান্ত্বনা দেবে?

যে শিক্ষক তখন বলেছিলেন, ‘ব্যবস্থা হয়ে যাবে’—তিনি কি সেই পরিবারের কান্নার পাশে দাঁড়াবেন?

তেলবাজি যদি যোগ্যতার বিকল্প হয়

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়গুলোর একটি হলো—যোগ্যতার জায়গায় তেলবাজি প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

একজন শিক্ষক যদি সত্য কথা বলার বদলে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে খুশি রাখাকে নিজের দায়িত্ব মনে করেন, তাহলে তিনি হয়তো পদকর্তার কাছে প্রিয় হতে পারেন; কিন্তু শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ব্যর্থ।

যে শিক্ষক জানেন একটি শিক্ষার্থী প্রস্তুত নয়, অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে তাকে কাগজে উত্তীর্ণ করে দেন—তিনি শুধু একটি নম্বরের অনিয়মে অংশ নেন না; তিনি একটি ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেন।

শিক্ষকতা পেশা হতে পারে, কিন্তু শিক্ষকতা কখনো শুধু চাকরি হতে পারে না।

এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।

প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পাস—কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কোথায়?

কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে হয়তো শতভাগ পাস একটি গৌরব।

কিন্তু আমরা কখনো কি প্রশ্ন করেছি—এই শতভাগ পাসের ভেতরে কতটা সত্যিকারের শিক্ষা আছে?

একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষায় পাস করেও মৌলিক জ্ঞান না পায়, নিজের ভাষায় একটি বক্তব্য লিখতে না পারে, প্রয়োজনীয় হিসাব করতে না পারে, যুক্তি দিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারে—তাহলে সেই পাসের মূল্য কোথায়?

সার্টিফিকেট হাতে একজন অপ্রস্তুত তরুণ তৈরি করা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়।

এটি বরং সমাজের ভবিষ্যতের জন্য একটি নীরব বিপদ।

তাহলে এত ফেল কেন?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—একটি পরীক্ষায় বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রশ্নপত্রের মান, শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি, শিক্ষকতার মান, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত ঘাটতি—সবই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কিন্তু এর পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষার ব্যবস্থাপনাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান টেস্ট পরীক্ষায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফলাফল গোপন করে থাকে, তাহলে সেই শিক্ষার্থীরা চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।

ফলে পাবলিক পরীক্ষার খাতায় যখন প্রকৃত জ্ঞান যাচাই হয়েছে, তখন কৃত্রিমভাবে চাপা দেওয়া দুর্বলতা বিস্ফোরণের মতো সামনে এসেছে।

এ কারণেই আজ শুধু ‘কেন ফেল করল?’ প্রশ্ন করলেই হবে না।

প্রশ্ন করতে হবে—

‘পাবলিক পরীক্ষার আগে তাদের প্রকৃত অবস্থাটা কেন আমাদের জানানো হয়নি?’

খাতা খুলুন, সত্য বেরিয়ে আসবে

সমাধান খুব কঠিন নয়।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।

টেস্ট পরীক্ষার মূল খাতা বের করা হোক।

ফলাফল শিটের সঙ্গে খাতার নম্বর মিলিয়ে দেখা হোক।

যে শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে ফেল করেছিল, কীভাবে সে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যোগ্য হলো—তার নথি পরীক্ষা করা হোক।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

কারণ সত্য যদি কাগজে থাকে, সেই কাগজ খুললেই সত্য বেরিয়ে আসবে।

আর যদি কোথাও কোনো অনিয়ম না থাকে, তদন্ত সেটিও প্রমাণ করবে।

আজ একজন শিক্ষার্থীর চোখের জল আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন

ভাবুন সেই পরিবারের কথা।

একজন বাবা হয়তো সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের প্রয়োজন কমিয়েছেন।

একজন মা হয়তো সন্তানের পরীক্ষার দিন রাত জেগে প্রার্থনা করেছেন।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো স্বপ্ন দেখেছে—ভালো ফল করবে, উচ্চশিক্ষায় যাবে, একদিন পরিবারের মুখে হাসি ফুটাবে।

ফলাফল প্রকাশের দিন তার হাতে যখন ‘ফেল’ লেখা কাগজটি আসে, তখন শুধু একজন শিক্ষার্থী কাঁদে না।

কাঁদে একটি পরিবার।

কাঁদে একজন মায়ের স্বপ্ন।

কাঁদে একজন বাবার পরিশ্রম।

কাঁদে সেই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

আর তখন যদি পেছনে ফিরে দেখা যায়—এই শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় দুর্বল ছিল, কিন্তু তাকে প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে কোনোভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছিল, তাহলে এই কান্নার দায় আমরা কার ওপর দেব?

শুধু শিক্ষার্থীর ওপর?

না।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হবে

আজ আমাদের দরকার কাউকে হেয় করা নয়; দরকার সত্য উদঘাটন করা।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়ম ভেঙে থাকেন—ব্যবস্থা নিতে হবে।

যদি কোনো শিক্ষক অনিয়মে সহযোগিতা করে থাকেন—জবাবদিহি করতে হবে।

যদি কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে—তা সংশোধন করতে হবে।

আর যদি কোথাও অভিযোগ মিথ্যা হয়—তাহলে নির্দোষদেরও রক্ষা করতে হবে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হবে যদি আমরা সবকিছু ভুলে যাই এবং পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকি।

কারণ একই ভুল আবার হলে পরের বছর আরও কিছু পরিবার কাঁদবে।

আর আমরা আবার বলব—‘শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি।’

শেষ কথা: এবার শুধু ফলাফল নয়, সত্যের হিসাব চাই

একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে তাকে ব্যর্থ বলে দূরে ঠেলে দেওয়া সহজ।

কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে এবং একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রশাসন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো—সে কেন ফেল করল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

আর সেই অনুসন্ধানে যদি বেরিয়ে আসে যে কোথাও অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কৃত্রিমভাবে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে, বারবার পরীক্ষা নিয়ে নিয়মের ফাঁক গলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে, তাহলে সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ—

একটি মিথ্যা পাস একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাঁচাতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে পারে না।

একটি জাল নম্বর একটি ফলাফলকে সুন্দর করতে পারে, কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎকে সুন্দর করতে পারে না।

আজ তাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

‘কতজন ফেল করেছে?’ নয়।

‘কেন ফেল করেছে?’

আর তারও আগে—

‘তাদের প্রকৃত দুর্বলতা কি আমরা পরীক্ষার আগেই দেখতে পেয়েছিলাম, নাকি আমরা নিজেরাই সেটিকে কাগজের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিলাম?’

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

কারণ পরীক্ষার খাতায় আজ যে ‘ফেল’ লেখা হয়েছে, সেটি হয়তো শুধু একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল নয়—এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার বিবেকের দরজায় লেখা একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।

সম্পাদক: এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ।

টেস্ট পরীক্ষার অনিয়ম, কৃত্রিম পাস এবং আজকের ভয়াবহ ফলাফল—একটি নির্মম আত্মজিজ্ঞাসা।

ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা?

আপডেট সময় : ০৯:১৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

 

ফলাফল প্রকাশের পর আমরা যখন দেখি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর হাতে ‘ফেল’ শব্দটি, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। কারও চোখে জল, কারও মুখে হতাশা, কোথাও বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস—কত স্বপ্ন যে একটি ফলাফলের কাগজে এসে ভেঙে পড়ে!

কিন্তু আজ একটি কঠিন প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে—

এই যে এত শিক্ষার্থী ফেল করল, তারা কি সত্যিই একা ফেল করেছে? নাকি তাদের সঙ্গে ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার একটি অংশ?

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো—যেসব শিক্ষার্থী টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজনকে প্রকৃত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? আর কতজনকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার পরীক্ষা নিয়ে কিংবা নম্বরের কারসাজির মাধ্যমে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যোগ্য দেখানো হয়েছিল?

প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু অস্বস্তিকর বলেই এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সেই সতর্কবার্তা কি আমরা ভুলে গেছি?

আপনার দেওয়া দলিলটি এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ২০১৮ সালের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মিথ্যা প্রত্যয়ন দিয়ে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষার খাতা সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো নমুনা পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছিল।

অর্থাৎ সমস্যাটি আজকের নয়।

প্রায় এক দশক আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।

তবু যদি আজও কোথাও সেই একই অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে প্রশ্ন শুধু কয়েকজন শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে নিয়ে নয়—প্রশ্ন আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়েও।

যে টেস্ট পরীক্ষা সতর্ক করার কথা, সেটিই যদি প্রতারণার হাতিয়ার হয়!

টেস্ট পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জন্য শাস্তি নয়; এটি সতর্কসংকেত।

টেস্ট পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী ফেল করলে তাকে বলা উচিত—

‘তোমার প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়। আরও পড়ো। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।’

কিন্তু যদি বলা হয়—

‘চিন্তা করো না, তোমাকে কোনোভাবে পাস করিয়ে দেওয়া হবে।’

তাহলে সেদিন শুধু একটি ফলাফল বদলায় না; বদলে যায় একজন শিক্ষার্থীর মানসিকতা।

সে শেখে—পরিশ্রমের চেয়ে ব্যবস্থা বড়।

সে শেখে—যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড়।

সে শেখে—ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়েও কাগজে সফল হওয়া যায়।

এই শিক্ষা কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা নেই; কিন্তু এমন অনিয়মের মাধ্যমে আমরা অজান্তেই শিক্ষার্থীদের সেই শিক্ষাই দিয়ে দিই।

দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার পরীক্ষা—তারপর সরাসরি পাবলিক পরীক্ষায়!

অভিযোগ যদি সত্য হয় যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, তারপর তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় শিক্ষার্থীর দুর্বলতা দূর করা, তাকে শেখানো এবং প্রস্তুত করা—তাহলে সেটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় শুধু ‘ফেল করা শিক্ষার্থীকে পাস দেখানো’, তাহলে সেটি শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতারণা।

একজন দুর্বল শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়া তাকে সাহায্য করা নয়।

তাকে আরও বড় পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেওয়া।

আজ টেস্টে তাকে কোনোভাবে পাস করানো হলো, কাল পাবলিক পরীক্ষায় সে ফেল করল। তখন তার পরিবারকে কে সান্ত্বনা দেবে?

যে শিক্ষক তখন বলেছিলেন, ‘ব্যবস্থা হয়ে যাবে’—তিনি কি সেই পরিবারের কান্নার পাশে দাঁড়াবেন?

তেলবাজি যদি যোগ্যতার বিকল্প হয়

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়গুলোর একটি হলো—যোগ্যতার জায়গায় তেলবাজি প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

একজন শিক্ষক যদি সত্য কথা বলার বদলে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে খুশি রাখাকে নিজের দায়িত্ব মনে করেন, তাহলে তিনি হয়তো পদকর্তার কাছে প্রিয় হতে পারেন; কিন্তু শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ব্যর্থ।

যে শিক্ষক জানেন একটি শিক্ষার্থী প্রস্তুত নয়, অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে তাকে কাগজে উত্তীর্ণ করে দেন—তিনি শুধু একটি নম্বরের অনিয়মে অংশ নেন না; তিনি একটি ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেন।

শিক্ষকতা পেশা হতে পারে, কিন্তু শিক্ষকতা কখনো শুধু চাকরি হতে পারে না।

এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।

প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পাস—কিন্তু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কোথায়?

কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে হয়তো শতভাগ পাস একটি গৌরব।

কিন্তু আমরা কখনো কি প্রশ্ন করেছি—এই শতভাগ পাসের ভেতরে কতটা সত্যিকারের শিক্ষা আছে?

একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষায় পাস করেও মৌলিক জ্ঞান না পায়, নিজের ভাষায় একটি বক্তব্য লিখতে না পারে, প্রয়োজনীয় হিসাব করতে না পারে, যুক্তি দিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারে—তাহলে সেই পাসের মূল্য কোথায়?

সার্টিফিকেট হাতে একজন অপ্রস্তুত তরুণ তৈরি করা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়।

এটি বরং সমাজের ভবিষ্যতের জন্য একটি নীরব বিপদ।

তাহলে এত ফেল কেন?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—একটি পরীক্ষায় বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রশ্নপত্রের মান, শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি, শিক্ষকতার মান, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত ঘাটতি—সবই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কিন্তু এর পাশাপাশি টেস্ট পরীক্ষার ব্যবস্থাপনাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান টেস্ট পরীক্ষায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফলাফল গোপন করে থাকে, তাহলে সেই শিক্ষার্থীরা চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।

ফলে পাবলিক পরীক্ষার খাতায় যখন প্রকৃত জ্ঞান যাচাই হয়েছে, তখন কৃত্রিমভাবে চাপা দেওয়া দুর্বলতা বিস্ফোরণের মতো সামনে এসেছে।

এ কারণেই আজ শুধু ‘কেন ফেল করল?’ প্রশ্ন করলেই হবে না।

প্রশ্ন করতে হবে—

‘পাবলিক পরীক্ষার আগে তাদের প্রকৃত অবস্থাটা কেন আমাদের জানানো হয়নি?’

খাতা খুলুন, সত্য বেরিয়ে আসবে

সমাধান খুব কঠিন নয়।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।

টেস্ট পরীক্ষার মূল খাতা বের করা হোক।

ফলাফল শিটের সঙ্গে খাতার নম্বর মিলিয়ে দেখা হোক।

যে শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে ফেল করেছিল, কীভাবে সে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যোগ্য হলো—তার নথি পরীক্ষা করা হোক।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

কারণ সত্য যদি কাগজে থাকে, সেই কাগজ খুললেই সত্য বেরিয়ে আসবে।

আর যদি কোথাও কোনো অনিয়ম না থাকে, তদন্ত সেটিও প্রমাণ করবে।

আজ একজন শিক্ষার্থীর চোখের জল আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন

ভাবুন সেই পরিবারের কথা।

একজন বাবা হয়তো সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের প্রয়োজন কমিয়েছেন।

একজন মা হয়তো সন্তানের পরীক্ষার দিন রাত জেগে প্রার্থনা করেছেন।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো স্বপ্ন দেখেছে—ভালো ফল করবে, উচ্চশিক্ষায় যাবে, একদিন পরিবারের মুখে হাসি ফুটাবে।

ফলাফল প্রকাশের দিন তার হাতে যখন ‘ফেল’ লেখা কাগজটি আসে, তখন শুধু একজন শিক্ষার্থী কাঁদে না।

কাঁদে একটি পরিবার।

কাঁদে একজন মায়ের স্বপ্ন।

কাঁদে একজন বাবার পরিশ্রম।

কাঁদে সেই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

আর তখন যদি পেছনে ফিরে দেখা যায়—এই শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় দুর্বল ছিল, কিন্তু তাকে প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে কোনোভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছিল, তাহলে এই কান্নার দায় আমরা কার ওপর দেব?

শুধু শিক্ষার্থীর ওপর?

না।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হবে

আজ আমাদের দরকার কাউকে হেয় করা নয়; দরকার সত্য উদঘাটন করা।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়ম ভেঙে থাকেন—ব্যবস্থা নিতে হবে।

যদি কোনো শিক্ষক অনিয়মে সহযোগিতা করে থাকেন—জবাবদিহি করতে হবে।

যদি কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে—তা সংশোধন করতে হবে।

আর যদি কোথাও অভিযোগ মিথ্যা হয়—তাহলে নির্দোষদেরও রক্ষা করতে হবে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হবে যদি আমরা সবকিছু ভুলে যাই এবং পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকি।

কারণ একই ভুল আবার হলে পরের বছর আরও কিছু পরিবার কাঁদবে।

আর আমরা আবার বলব—‘শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি।’

শেষ কথা: এবার শুধু ফলাফল নয়, সত্যের হিসাব চাই

একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে তাকে ব্যর্থ বলে দূরে ঠেলে দেওয়া সহজ।

কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে এবং একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা প্রশাসন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো—সে কেন ফেল করল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

আর সেই অনুসন্ধানে যদি বেরিয়ে আসে যে কোথাও অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কৃত্রিমভাবে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে, বারবার পরীক্ষা নিয়ে নিয়মের ফাঁক গলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে, তাহলে সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ—

একটি মিথ্যা পাস একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাঁচাতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে পারে না।

একটি জাল নম্বর একটি ফলাফলকে সুন্দর করতে পারে, কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎকে সুন্দর করতে পারে না।

আজ তাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

‘কতজন ফেল করেছে?’ নয়।

‘কেন ফেল করেছে?’

আর তারও আগে—

‘তাদের প্রকৃত দুর্বলতা কি আমরা পরীক্ষার আগেই দেখতে পেয়েছিলাম, নাকি আমরা নিজেরাই সেটিকে কাগজের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিলাম?’

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।

কারণ পরীক্ষার খাতায় আজ যে ‘ফেল’ লেখা হয়েছে, সেটি হয়তো শুধু একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল নয়—এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার বিবেকের দরজায় লেখা একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।

সম্পাদক: এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু।