ঢাকা ১২:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
পুলিশ দাঁড়িয়ে, নারী আক্রান্ত—রাষ্ট্র তখন কোথায়? খুলনায় আপত্তিকর অবস্থায় আটকের অভিযোগ, নিজেকে বাগেরহাট আদালতের পেশকার দাবি; সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ। বৃহত্তম চট্টগ্রাম মহানগর নাগরিক ফোরামের নতুন কমিটি গঠিত সভাপতি হামিদ হোসেন, সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া,সাংগঠনিক অরূপ চন্দ্র।  বোয়ালখালীতে ট্রেনে কাটা পড়ে তরুণী গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু। ঝালকাঠিতে জমি নিয়ে বিরোধ, বিভ্রান্তিকর প্রচারণার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন। গোপালপুরে বৈরাণ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের আয়োজনে সাহিত্য আড্ডা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খুলনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ক্যামেরা-মোবাইল ও টাকা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ। মুকসুদপুর পৌরসভার বেহাল দশা : নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ২৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের আশায় দিন গুনছে কর্তৃপক্ষ । শিক্ষকের সামনে বই খুলে পরীক্ষা, সাংবাদিকদের মারধর করে আটকে রাখা,এ কোন বর্বরতা? যশোরের শার্শায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার।
রাজবাড়ীর ঘটনা শুধু একটি হামলার ভিডিও নয়; এটি আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি আমাদের আস্থার কঠিন পরীক্ষা।

পুলিশ দাঁড়িয়ে, নারী আক্রান্ত—রাষ্ট্র তখন কোথায়?

 

একজন নারী। প্রকাশ্য স্থান। চারপাশে মানুষ। পাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। অথচ সেই নারীর ওপর চলছে ধাক্কা, লাথি, মারধর! দৃশ্যটি কেবল বিব্রতকর নয়—এটি আতঙ্কজনক।

রাজবাড়ীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—একজন নাগরিক যখন প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন, তখন তাকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের প্রহরীরা কোথায় ছিলেন?

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান এবং আক্রান্ত নারীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উল্লেখ করে নানা তথ্য ছড়িয়েছে। পরবর্তী তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দাবি সঠিক নয়। আক্রান্ত নারী একজন নারী উদ্যোক্তা। তাই যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক পক্ষকে দায়ী করা সমীচীন নয়।

কিন্তু এই সংশোধন ঘটনার গুরুত্ব একটুও কমায় না।বরং প্রশ্নটিকে আরও মৌলিক করে তোলে—একজন সাধারণ নাগরিকও কি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখেন না? অবশ্যই রাখেন।অভিযোগ থাকলে আদালত আছে, লাথি দেওয়ার অধিকার নেই

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। ব্যবসায়িক বিরোধ থাকতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। এমনকি কেউ আইন ভঙ্গ করেছেন—এমন অভিযোগও উঠতে পারে।

কিন্তু অভিযোগের বিচার হবে কোথায়? আদালতে।কোনো রাস্তার মোড়ে নয়।কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে নয়।কোনো সংগঠনের সভায় নয়।আর কোনো ব্যক্তির হাতে তো নয়ই।

অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে মামলা হবে। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবে।এই প্রক্রিয়াটিই সভ্য সমাজের পরিচয়।

কিন্তু যদি আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করি, যেখানে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে প্রকাশ্যে অপমান, লাঞ্ছিত কিংবা মারধর করা যাবে, তাহলে আমরা আসলে বিচারব্যবস্থাকেই অস্বীকার করছি।জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়া মানে আইনের শাসনের ভিত্তিতে আঘাত করা।

পুলিশ কি শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে?

এখানেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে আসে।পুলিশ সদস্যরা যে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উত্তেজিত জনতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কাজ নয়। একটি ভিডিওর কয়েকটি সেকেন্ড দেখে পুরো বাহিনীকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

কিন্তু অন্যদিকে এটিও সত্য—দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রমও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।

যদি কোনো নাগরিক পুলিশের উপস্থিতিতে আক্রান্ত হন, তাহলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন উঠবেই।যদি যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তদন্তে তা স্পষ্ট হোক।যদি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা থেকে থাকে, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসুক।

কারণ পুলিশের পোশাক শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও বহন করে।একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে পুলিশের দিকে তাকান, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্রের দিকেই তাকান।সেই দৃষ্টিকে ব্যর্থ করা যাবে না।

আজ একজন নারী—আগামীকাল কে?

এই ঘটনাকে শুধু একজন নারীকে মারধরের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।কারণ এর একটি ভয়াবহ সামাজিক অভিঘাত আছে।একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন—“আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে আমাকে আক্রমণ করা হতে পারে।”

“আমি অভিযোগ করলে প্রতিপক্ষ আমাকে হেনস্তা করতে পারে।”“পুলিশের কাছে গেলেও হয়তো নিরাপত্তা পাব না।”তাহলে তিনি পরবর্তী সময়ে কী করবেন? চুপ থাকবেন।অন্যায় সহ্য করবেন।

অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না।আর এভাবেই অপরাধীরা আরও সাহসী হবে।

একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন দুর্বল মানুষও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পান।কারণ তিনি জানেন—রাষ্ট্র তার পাশে আছে।

এই বিশ্বাসটি ভেঙে গেলে আইনের বই অক্ষত থাকলেও আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যায়।নারীর ওপর প্রকাশ্য সহিংসতা—এ লজ্জা কার?

একজন নারীকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কোনোভাবেই ‘সামান্য ঘটনা’ নয়।

নারী ব্যবসায়ী হোন, চাকরিজীবী হোন, রাজনীতিক হোন, শ্রমজীবী হোন কিংবা সাধারণ গৃহিণী—তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার অধিকার সমান।

একজন নারী নিজের পেশাগত বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন—এটাই স্বাভাবিক।তার সঙ্গে মতবিরোধ থাকলে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।অভিযোগ থাকলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

কিন্তু নারীর শরীরে আঘাত করে কোনো পুরুষত্ব, কোনো সংগঠনের শক্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রমাণ হয় না।বরং এটি প্রমাণ করে—আইনের প্রতি কতটা অবজ্ঞা তৈরি হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিও মানেই সম্পূর্ণ সত্য নয়

রাজবাড়ীর ঘটনা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই তার সঙ্গে নানা গল্প জুড়ে দেওয়া কতটা বিপজ্জনক।

ভিডিওর একটি অংশ দেখা যায়।পুরো প্রেক্ষাপট দেখা যায় না।কে আগে কী করেছে, কেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, কার কী ভূমিকা ছিল—এসব জানতে তদন্ত প্রয়োজন।তাই কাউকে ‘অপরাধী’ ঘোষণা করার আগে তদন্তের অপেক্ষা করা জরুরি।

কিন্তু তদন্তের অপেক্ষা করার অর্থ এই নয় যে প্রকাশ্য সহিংসতাকে উপেক্ষা করতে হবে।বরং দুটি কাজ একই সঙ্গে করতে হবে—সত্য উদঘাটন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

প্রশাসনের কাছে জনগণের প্রশ্ন

রাজবাড়ীর ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনের কাছে জনগণের কয়েকটি সরল প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক—

প্রথমত, ঘটনাটি কীভাবে ঘটল?

দ্বিতীয়ত, হামলায় কারা জড়িত ছিল?

তৃতীয়ত, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল?

চতুর্থত, আক্রান্ত নারীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?

পঞ্চমত, কারও দায়িত্বে অবহেলা বা আইনভঙ্গের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন।কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহ বাড়ায়।স্বচ্ছ তদন্ত সন্দেহ দূর করে।কঠোরতা চাই, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়।

আমরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই—তবে সেই শাস্তি অবশ্যই আইনের বিধান অনুযায়ী হতে হবে।কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাড় দেওয়া যাবে না।আবার রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তদন্ত ছাড়াই কাউকে অপরাধী বানানোও যাবে না।রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিশোধ নেওয়া নয়।রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা।এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আইনের শাসন মানে হলো—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, আইনের মুখোমুখি হবে; আর নিরপরাধ ব্যক্তি যত দুর্বলই হোক, রাষ্ট্র তাকে অন্যায়ের শিকার হতে দেবে না।

শেষ প্রশ্নটি তাই পুলিশের কাছে নয়—রাষ্ট্রের কাছে

রাজবাড়ীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা পুলিশের দিকে আঙুল তুলছি।কিন্তু আরও বড় প্রশ্নটি আসলে রাষ্ট্রের কাছে।রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে নিরাপদ রাখবে?একজন নারী যখন প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন, তখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাষ্ট্র কি বলবে—“তদন্ত চলছে”?

নাকি রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে হামলার আগেই মানুষ জানবে—আইন ভাঙলে ছাড় নেই? আজ একজন নারী আক্রান্ত হয়েছেন।কাল অন্য কেউ হতে পারেন।আজ একজন উদ্যোক্তা।কাল একজন শিক্ষক।পরশু একজন সাংবাদিক।তারপর হয়তো কোনো সাধারণ কৃষক, শ্রমিক কিংবা পথচারী।

যেদিন মানুষ বিপদের মুহূর্তে পুলিশের বদলে মোবাইল ক্যামেরার দিকে তাকাতে শুরু করবে, সেদিন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথাও গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।

তাই রাজবাড়ীর ঘটনা চাপা দেওয়ার বিষয় নয়।এটি তদন্তের বিষয়।এটি জবাবদিহির বিষয়।এটি নারী নিরাপত্তার বিষয়।এটি পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের বিষয়।সবচেয়ে বড় কথা—এটি আইনের শাসনের প্রশ্ন।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শক্তিশালী ব্যক্তি আইনকে ভয় পাবে না এবং দুর্বল নাগরিক আইনকে আশ্রয় হিসেবে পাবে না।

আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন নাগরিকের পরিচয় নয়—তার নাগরিকত্বই তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।আর সেই নিশ্চয়তার নামই—আইনের শাসন।

পুলিশ যেন দর্শক না হয়, প্রশাসন যেন নীরব না থাকে, আর আইন যেন কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে ওঠে—রাজবাড়ীর ঘটনা থেকে রাষ্ট্রের জন্য এটাই হোক সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

পুলিশ দাঁড়িয়ে, নারী আক্রান্ত—রাষ্ট্র তখন কোথায়?

রাজবাড়ীর ঘটনা শুধু একটি হামলার ভিডিও নয়; এটি আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি আমাদের আস্থার কঠিন পরীক্ষা।

পুলিশ দাঁড়িয়ে, নারী আক্রান্ত—রাষ্ট্র তখন কোথায়?

আপডেট সময় : ১০:৩৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

 

একজন নারী। প্রকাশ্য স্থান। চারপাশে মানুষ। পাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। অথচ সেই নারীর ওপর চলছে ধাক্কা, লাথি, মারধর! দৃশ্যটি কেবল বিব্রতকর নয়—এটি আতঙ্কজনক।

রাজবাড়ীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—একজন নাগরিক যখন প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন, তখন তাকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রের প্রহরীরা কোথায় ছিলেন?

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান এবং আক্রান্ত নারীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উল্লেখ করে নানা তথ্য ছড়িয়েছে। পরবর্তী তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দাবি সঠিক নয়। আক্রান্ত নারী একজন নারী উদ্যোক্তা। তাই যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক পক্ষকে দায়ী করা সমীচীন নয়।

কিন্তু এই সংশোধন ঘটনার গুরুত্ব একটুও কমায় না।বরং প্রশ্নটিকে আরও মৌলিক করে তোলে—একজন সাধারণ নাগরিকও কি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখেন না? অবশ্যই রাখেন।অভিযোগ থাকলে আদালত আছে, লাথি দেওয়ার অধিকার নেই

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। ব্যবসায়িক বিরোধ থাকতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। এমনকি কেউ আইন ভঙ্গ করেছেন—এমন অভিযোগও উঠতে পারে।

কিন্তু অভিযোগের বিচার হবে কোথায়? আদালতে।কোনো রাস্তার মোড়ে নয়।কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে নয়।কোনো সংগঠনের সভায় নয়।আর কোনো ব্যক্তির হাতে তো নয়ই।

অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে মামলা হবে। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবে।এই প্রক্রিয়াটিই সভ্য সমাজের পরিচয়।

কিন্তু যদি আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করি, যেখানে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে প্রকাশ্যে অপমান, লাঞ্ছিত কিংবা মারধর করা যাবে, তাহলে আমরা আসলে বিচারব্যবস্থাকেই অস্বীকার করছি।জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়া মানে আইনের শাসনের ভিত্তিতে আঘাত করা।

পুলিশ কি শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে?

এখানেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে আসে।পুলিশ সদস্যরা যে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উত্তেজিত জনতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কাজ নয়। একটি ভিডিওর কয়েকটি সেকেন্ড দেখে পুরো বাহিনীকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

কিন্তু অন্যদিকে এটিও সত্য—দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রমও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।

যদি কোনো নাগরিক পুলিশের উপস্থিতিতে আক্রান্ত হন, তাহলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন উঠবেই।যদি যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তদন্তে তা স্পষ্ট হোক।যদি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা থেকে থাকে, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসুক।

কারণ পুলিশের পোশাক শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও বহন করে।একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে পুলিশের দিকে তাকান, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্রের দিকেই তাকান।সেই দৃষ্টিকে ব্যর্থ করা যাবে না।

আজ একজন নারী—আগামীকাল কে?

এই ঘটনাকে শুধু একজন নারীকে মারধরের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।কারণ এর একটি ভয়াবহ সামাজিক অভিঘাত আছে।একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন—“আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে আমাকে আক্রমণ করা হতে পারে।”

“আমি অভিযোগ করলে প্রতিপক্ষ আমাকে হেনস্তা করতে পারে।”“পুলিশের কাছে গেলেও হয়তো নিরাপত্তা পাব না।”তাহলে তিনি পরবর্তী সময়ে কী করবেন? চুপ থাকবেন।অন্যায় সহ্য করবেন।

অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না।আর এভাবেই অপরাধীরা আরও সাহসী হবে।

একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন দুর্বল মানুষও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পান।কারণ তিনি জানেন—রাষ্ট্র তার পাশে আছে।

এই বিশ্বাসটি ভেঙে গেলে আইনের বই অক্ষত থাকলেও আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যায়।নারীর ওপর প্রকাশ্য সহিংসতা—এ লজ্জা কার?

একজন নারীকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কোনোভাবেই ‘সামান্য ঘটনা’ নয়।

নারী ব্যবসায়ী হোন, চাকরিজীবী হোন, রাজনীতিক হোন, শ্রমজীবী হোন কিংবা সাধারণ গৃহিণী—তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার অধিকার সমান।

একজন নারী নিজের পেশাগত বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন—এটাই স্বাভাবিক।তার সঙ্গে মতবিরোধ থাকলে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।অভিযোগ থাকলে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।

কিন্তু নারীর শরীরে আঘাত করে কোনো পুরুষত্ব, কোনো সংগঠনের শক্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রমাণ হয় না।বরং এটি প্রমাণ করে—আইনের প্রতি কতটা অবজ্ঞা তৈরি হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিও মানেই সম্পূর্ণ সত্য নয়

রাজবাড়ীর ঘটনা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই তার সঙ্গে নানা গল্প জুড়ে দেওয়া কতটা বিপজ্জনক।

ভিডিওর একটি অংশ দেখা যায়।পুরো প্রেক্ষাপট দেখা যায় না।কে আগে কী করেছে, কেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, কার কী ভূমিকা ছিল—এসব জানতে তদন্ত প্রয়োজন।তাই কাউকে ‘অপরাধী’ ঘোষণা করার আগে তদন্তের অপেক্ষা করা জরুরি।

কিন্তু তদন্তের অপেক্ষা করার অর্থ এই নয় যে প্রকাশ্য সহিংসতাকে উপেক্ষা করতে হবে।বরং দুটি কাজ একই সঙ্গে করতে হবে—সত্য উদঘাটন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

প্রশাসনের কাছে জনগণের প্রশ্ন

রাজবাড়ীর ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনের কাছে জনগণের কয়েকটি সরল প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক—

প্রথমত, ঘটনাটি কীভাবে ঘটল?

দ্বিতীয়ত, হামলায় কারা জড়িত ছিল?

তৃতীয়ত, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল?

চতুর্থত, আক্রান্ত নারীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?

পঞ্চমত, কারও দায়িত্বে অবহেলা বা আইনভঙ্গের প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের সামনে আসা প্রয়োজন।কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহ বাড়ায়।স্বচ্ছ তদন্ত সন্দেহ দূর করে।কঠোরতা চাই, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়।

আমরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই—তবে সেই শাস্তি অবশ্যই আইনের বিধান অনুযায়ী হতে হবে।কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাড় দেওয়া যাবে না।আবার রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তদন্ত ছাড়াই কাউকে অপরাধী বানানোও যাবে না।রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিশোধ নেওয়া নয়।রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা।এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আইনের শাসন মানে হলো—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, আইনের মুখোমুখি হবে; আর নিরপরাধ ব্যক্তি যত দুর্বলই হোক, রাষ্ট্র তাকে অন্যায়ের শিকার হতে দেবে না।

শেষ প্রশ্নটি তাই পুলিশের কাছে নয়—রাষ্ট্রের কাছে

রাজবাড়ীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা পুলিশের দিকে আঙুল তুলছি।কিন্তু আরও বড় প্রশ্নটি আসলে রাষ্ট্রের কাছে।রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে নিরাপদ রাখবে?একজন নারী যখন প্রকাশ্যে আক্রান্ত হন, তখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাষ্ট্র কি বলবে—“তদন্ত চলছে”?

নাকি রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে হামলার আগেই মানুষ জানবে—আইন ভাঙলে ছাড় নেই? আজ একজন নারী আক্রান্ত হয়েছেন।কাল অন্য কেউ হতে পারেন।আজ একজন উদ্যোক্তা।কাল একজন শিক্ষক।পরশু একজন সাংবাদিক।তারপর হয়তো কোনো সাধারণ কৃষক, শ্রমিক কিংবা পথচারী।

যেদিন মানুষ বিপদের মুহূর্তে পুলিশের বদলে মোবাইল ক্যামেরার দিকে তাকাতে শুরু করবে, সেদিন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথাও গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।

তাই রাজবাড়ীর ঘটনা চাপা দেওয়ার বিষয় নয়।এটি তদন্তের বিষয়।এটি জবাবদিহির বিষয়।এটি নারী নিরাপত্তার বিষয়।এটি পুলিশের পেশাগত দায়িত্বের বিষয়।সবচেয়ে বড় কথা—এটি আইনের শাসনের প্রশ্ন।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শক্তিশালী ব্যক্তি আইনকে ভয় পাবে না এবং দুর্বল নাগরিক আইনকে আশ্রয় হিসেবে পাবে না।

আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন নাগরিকের পরিচয় নয়—তার নাগরিকত্বই তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।আর সেই নিশ্চয়তার নামই—আইনের শাসন।

পুলিশ যেন দর্শক না হয়, প্রশাসন যেন নীরব না থাকে, আর আইন যেন কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে ওঠে—রাজবাড়ীর ঘটনা থেকে রাষ্ট্রের জন্য এটাই হোক সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।