ঢাকা ০১:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
যমুনা অয়েলে ব্যাপক রদবদল, বদলী হয়েও চেম্বার দখলে রেখেছে ক্ষমতাধর মাসুদুল ইসলাম। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মোহনা টিভির সিনিয়র নিউজ প্রেজেন্টার ও ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ মুহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ চাকুরীচ্যুত! ব্র্যাক সীডের আয়োজনে কাহারোলে হাইব্রিড ধানের অধিক ফলন নিশ্চিতকরণে কর্মশালা অনুষ্ঠিত। দিনাজপুরে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ এর বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত। ইতালি প্রবাসী বাড়িতে ভয়াবহ ডাকাতি, ১৫ ভরি স্বর্নালংকার, নগদ সারে চার লাখ টাকা ও স্মার্ট ফোন লুট।  মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের প্রস্তুতি সভায় নাজিমুর রহমান শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের ঐক্যের প্রতীক মে দিবস। অনলাইন জুয়ায় অর্থ সংকটে আপন দাদীকে হত্যা, অবশেষে স্বর্ণালঙ্কার সহ পুলিশের জালে আটক তিনজন। নোয়াখালীতে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগ। বালিয়াকান্দিতে নবযোগদানকৃত জেলা প্রশাসকের সাথে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। কালবৈশাখী ঝড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, টাওয়ার ভেঙে যোগাযোগ ব্যাহত।

অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলমের অতীত স্মৃতির “বিজয় ৭১”

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৪৬ জন সংবাদটি পড়েছেন

ফিরে দেখা বিজয় ৭১(পরবর্তী অংশ)

ছোট খালার শ্বশুর বাড়ি ছিল কামারখালী বাজারের একটু দূরে গন্ধখালী গ্রামে। ঠিক গড়াই থেকে মধুমতী নদীর উৎপত্তি স্থলের নিকট। যেখানে নদী বাক নিয়েছে পশ্চিমে। কামারখালীতে বোমা এবং শেল পড়ার পর আশপাশের সাধারণ নাগরিক নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে লাগল। গন্ধখালী থেকেও কয়েকজন এসেছিলেন এখানে। কেউ কেউ আবার ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে গরু ছাগল দেখা শোনার জন্য রয়ে গিয়েছিল। এ সময় মানুষের ঢল নেমেছিল সেলামত পুর ও হরিনা ডাংগা ঘাটে। কারও কোলে ছোট শিশু,বৃদ্ধ বৃদ্ধারা যারা হাটতে পারছে না তাদেরকে ঝাকায়, ঝুড়িতে,বাকে করে যুবারা নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছিল।কেউ কেউ গরু বাছুর গলা থেকে রশি মুক্ত করে ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বের হয়ে পড়ল।উদ্দেশ্য নিরাপদ আশ্রয়। এর চেয়েও নদীর ঘাটে বেশি নারী পুরুষের ভিড় দেখেছিলাম এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে আশ্রয়।

 

মা যতই নিষেধ করুক বাড়ির বাইরে যেতে কিশোর মন নিষেধ মানেনা।এদিন আমাদের বাড়ির দক্ষিণে একটি খাল ছিল। সে খালে বর্ষায় পারাপারের জন্য একটি সাঁকো থাকত। এ সময় খালে তেমন পানি ছিল না। তবে সাঁকোও তুলে নিয়ে গিয়েছিল।পারাপার হওয়া গেলেও গাড়ি পার হওয়ার মত ছিল না।তাই মুক্তি যোদ্ধা নুরুল ইসলাম ও জাফর বিশ্বাস কোদাল দিয়ে একটু দূরে বিকল্প পথ তৈরী করে দিয়েছিল।আমি সেটা দেখেছিলাম। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম এ রাস্তা কেন?ওনারা বলেছিলেন, “শিখ সেনা পার হবে।” এদিন আমি একাই খালের ধারে দাড়িয়ে ছিলাম।রাস্তায় তখন লোক চলাচলও ছিল না তেমন। অনেকটাই নির্জন।খালের ওপারে একটি জীপ এসে থামল।ভিতরে ড্রাইভার আর একজন কি দুই জন সেনা দেখা গিয়েছিল। বয়স্ক কোন লোক ছিল না আশেপাশে। ইশারা দিয়ে আমাকে ডাকল। কি জিজ্ঞেস করল বুঝলাম না।তবে হরিনা ডাংগা ঘাটকে যখন হরাডাংগা ঘাট বলল, তখন বুঝলাম এরা হরিনা ডাংগা ঘাটে যাবে।তাই ইশারায় এবং আমার ভাষায় রাস্তা দেখিয়ে দিলাম। ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে ঘাটে যাওয়ার রাস্তা।ওরা চলল।তাকিয়ে থাকলাম, দেখলাম তারা ঠিক রাস্তা ধরে ঘাটের দিকে যাচ্ছে।

এ সময় সন্ধার পূর্বেই এ আঞ্চলিক প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নেমে আসত।ভয় আর অজানা শংকায় চারিদিকে নীরব হয়ে যেত।এ পরিবারে ভয় ও অজানা শংকা বেশি ছিল।কারণ নিজের পরিস্থিতি জনিত এবং পাকিস্তানে বন্দী ছোট খালুকে নিয়ে। মুরব্বিগণ রাতে সবাইকে সাবধান করে দিতেন কেউ যেন কোন কথা না বলে।কারণ ঘরের কোনায় গোয়েন্দা থাকতে পারে।তাই আমরা সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকলে কোন গল্প করতাম না।

 

এ রাতে আমরা সন্ধ্যায়ই রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছি। রাস্তার পাশেই ঘর।হঠাৎ রাস্তায় হাজারো বুটের আওয়াজে ঘুম ভেংগে গেল। আমার নানী ফিসফিস করে বললেন, ” কেউ কোন কথা বলো না। রাস্তা দিয়ে শিখ সেনা যাচ্ছে।”সবাই চুপ করে রইল।

 

সব সেনা হরিন ডাংগা খেয়া ঘাটে জড়ো হয়ে গেল। সকাল বেলা উভচর ট্যংক গুলো কুমিরের মত ভাসতে ভাসতে নদীর অপর পাড়ে কোমরপুর খালের ভিতর দিয়ে কামার খালীর খুব কাছাকাছি পৌছে গেল। এ খালটি যৌথ বাহিনীর জন্য ট্রেঞ্চ হিসেবে কাজ করেছিল। হরিনা ডাংগা ঘাটের সেনা গুলো কালু ও বারিক শিকদার এবং মুক্তি যোদ্ধারা পার করে দিল। এ সেনাদের পথ দেখিয়ে যুদ্ধের মাঠে মানে একেবারে ফ্রন্ট লাইনে নিয়েছিলেন মো:এয়াকুব হোসেন মৃধা। আমাদের গ্রামেরই একজন পাকিস্তানি অব:সেনা। কামারখালীর পাক সেনাদের ইংরেজি U এর আকারে যৌথ বাহিনীর আক্রমণ শুর হলো। ওয়াপ দা এবং নাকোল এলাকা থেকেও আর একটি দল আক্রমণ শুরু করেছিল।

 

কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড যুদ্ধ হলো। একেবারে হাতা হাতি যুদ্ধ। মাঝে মাঝে দু একটি শেল নদী অতিক্রম করে হরিনা ডাংগা ঘাটে পড়তে লাগল।কামান আর মর্টার শেলের শব্দে মাঝে মাঝে মাটি কেপে উঠত।এ রকম তিন চারদিন চলল।

 

একদিন রাতে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে নি:শ্বাসেও ঘুম ভাংগার মত নীরবতা। শিয়ালের ডাক নেই,পেচার প্রহর গননার আর্তনাদ ছিল না। সে এক রাতের নতুন নীরবতা।

সকাল হলো। রাতের নীরবতা ভেংগে,আঁধারের কাল রং ভেদ করে নতুন সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে দিবস এলো। আমরা ঘুম থেকে উঠে রোদ পোহাচ্ছিলাম। হঠাৎ কামারখালীর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে হেলিকপ্টার দেখলাম। সেগুলো উড়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছে।খবর পেলাম পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা ছুটে গেলাম হরিনা ডাংগা ঘাটে। ঘাটে তখন কামারখানীর আত্মসমর্পণকৃত সেনাও ছিল।লোকে গালিগালাজ করছে।ছেলেরা ওদেরকে বলছে বল,”জয় বাংলা “ওরা বলছে,” জুই বাংলা”।ভারতীয় আহত নিহত সেনা দেখেছি। দেখেছি পাকিস্তানের পরাজিত বিদ্ধস্ত সেনার বিষন্ন অবয়ব।ভারতীয় জয়ী সেনাদের মুখও যেন নিহতদের জন্য বিষন্ন ছিল।

কয়েক দিন পর কামারখালী হাটে গেলাম। ঘাটের ওপরের কোমর পুর গ্রামের মধ্যে খালের পাশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তার দু পাশের ট্রেন্সগুলি থেকে নিহত পাকিস্তানি হতভাগা সেনার পচা গলা লাশের রক্তে ভেজা মাটিও দেখলাম।তখনও নিহতের পচা গলা রক্ত বুজ বুজ করে মাটির উপরে উঠছে আর গন্ধ ছড়াচ্ছে।

বিজয় দেখেছি, বিজয়ের মূল্যও দিতে দেখেছি। যারা হারিয়েছে তারা সেদিনও বিষন্ন ছিল। বিজয়ের আনন্দে তারাই হেসেছে যাদের কেউ হারায়নি।সেদিন যারা হেসেছিল আজও তারাই হাসে।যাদের হারিয়েছে তারা আজও হাসেনা।বেদন ব্যাথায় বোবা।

আজকের এই বিজয়ের দিনে নিহতদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

যমুনা অয়েলে ব্যাপক রদবদল, বদলী হয়েও চেম্বার দখলে রেখেছে ক্ষমতাধর মাসুদুল ইসলাম।

অধ্যক্ষ সৈয়দ রবিউল আলমের অতীত স্মৃতির “বিজয় ৭১”

আপডেট সময় : ১০:৪৭:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

ফিরে দেখা বিজয় ৭১(পরবর্তী অংশ)

ছোট খালার শ্বশুর বাড়ি ছিল কামারখালী বাজারের একটু দূরে গন্ধখালী গ্রামে। ঠিক গড়াই থেকে মধুমতী নদীর উৎপত্তি স্থলের নিকট। যেখানে নদী বাক নিয়েছে পশ্চিমে। কামারখালীতে বোমা এবং শেল পড়ার পর আশপাশের সাধারণ নাগরিক নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে লাগল। গন্ধখালী থেকেও কয়েকজন এসেছিলেন এখানে। কেউ কেউ আবার ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে গরু ছাগল দেখা শোনার জন্য রয়ে গিয়েছিল। এ সময় মানুষের ঢল নেমেছিল সেলামত পুর ও হরিনা ডাংগা ঘাটে। কারও কোলে ছোট শিশু,বৃদ্ধ বৃদ্ধারা যারা হাটতে পারছে না তাদেরকে ঝাকায়, ঝুড়িতে,বাকে করে যুবারা নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছিল।কেউ কেউ গরু বাছুর গলা থেকে রশি মুক্ত করে ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বের হয়ে পড়ল।উদ্দেশ্য নিরাপদ আশ্রয়। এর চেয়েও নদীর ঘাটে বেশি নারী পুরুষের ভিড় দেখেছিলাম এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে আশ্রয়।

 

মা যতই নিষেধ করুক বাড়ির বাইরে যেতে কিশোর মন নিষেধ মানেনা।এদিন আমাদের বাড়ির দক্ষিণে একটি খাল ছিল। সে খালে বর্ষায় পারাপারের জন্য একটি সাঁকো থাকত। এ সময় খালে তেমন পানি ছিল না। তবে সাঁকোও তুলে নিয়ে গিয়েছিল।পারাপার হওয়া গেলেও গাড়ি পার হওয়ার মত ছিল না।তাই মুক্তি যোদ্ধা নুরুল ইসলাম ও জাফর বিশ্বাস কোদাল দিয়ে একটু দূরে বিকল্প পথ তৈরী করে দিয়েছিল।আমি সেটা দেখেছিলাম। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম এ রাস্তা কেন?ওনারা বলেছিলেন, “শিখ সেনা পার হবে।” এদিন আমি একাই খালের ধারে দাড়িয়ে ছিলাম।রাস্তায় তখন লোক চলাচলও ছিল না তেমন। অনেকটাই নির্জন।খালের ওপারে একটি জীপ এসে থামল।ভিতরে ড্রাইভার আর একজন কি দুই জন সেনা দেখা গিয়েছিল। বয়স্ক কোন লোক ছিল না আশেপাশে। ইশারা দিয়ে আমাকে ডাকল। কি জিজ্ঞেস করল বুঝলাম না।তবে হরিনা ডাংগা ঘাটকে যখন হরাডাংগা ঘাট বলল, তখন বুঝলাম এরা হরিনা ডাংগা ঘাটে যাবে।তাই ইশারায় এবং আমার ভাষায় রাস্তা দেখিয়ে দিলাম। ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে ঘাটে যাওয়ার রাস্তা।ওরা চলল।তাকিয়ে থাকলাম, দেখলাম তারা ঠিক রাস্তা ধরে ঘাটের দিকে যাচ্ছে।

এ সময় সন্ধার পূর্বেই এ আঞ্চলিক প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নেমে আসত।ভয় আর অজানা শংকায় চারিদিকে নীরব হয়ে যেত।এ পরিবারে ভয় ও অজানা শংকা বেশি ছিল।কারণ নিজের পরিস্থিতি জনিত এবং পাকিস্তানে বন্দী ছোট খালুকে নিয়ে। মুরব্বিগণ রাতে সবাইকে সাবধান করে দিতেন কেউ যেন কোন কথা না বলে।কারণ ঘরের কোনায় গোয়েন্দা থাকতে পারে।তাই আমরা সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকলে কোন গল্প করতাম না।

 

এ রাতে আমরা সন্ধ্যায়ই রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছি। রাস্তার পাশেই ঘর।হঠাৎ রাস্তায় হাজারো বুটের আওয়াজে ঘুম ভেংগে গেল। আমার নানী ফিসফিস করে বললেন, ” কেউ কোন কথা বলো না। রাস্তা দিয়ে শিখ সেনা যাচ্ছে।”সবাই চুপ করে রইল।

 

সব সেনা হরিন ডাংগা খেয়া ঘাটে জড়ো হয়ে গেল। সকাল বেলা উভচর ট্যংক গুলো কুমিরের মত ভাসতে ভাসতে নদীর অপর পাড়ে কোমরপুর খালের ভিতর দিয়ে কামার খালীর খুব কাছাকাছি পৌছে গেল। এ খালটি যৌথ বাহিনীর জন্য ট্রেঞ্চ হিসেবে কাজ করেছিল। হরিনা ডাংগা ঘাটের সেনা গুলো কালু ও বারিক শিকদার এবং মুক্তি যোদ্ধারা পার করে দিল। এ সেনাদের পথ দেখিয়ে যুদ্ধের মাঠে মানে একেবারে ফ্রন্ট লাইনে নিয়েছিলেন মো:এয়াকুব হোসেন মৃধা। আমাদের গ্রামেরই একজন পাকিস্তানি অব:সেনা। কামারখালীর পাক সেনাদের ইংরেজি U এর আকারে যৌথ বাহিনীর আক্রমণ শুর হলো। ওয়াপ দা এবং নাকোল এলাকা থেকেও আর একটি দল আক্রমণ শুরু করেছিল।

 

কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড যুদ্ধ হলো। একেবারে হাতা হাতি যুদ্ধ। মাঝে মাঝে দু একটি শেল নদী অতিক্রম করে হরিনা ডাংগা ঘাটে পড়তে লাগল।কামান আর মর্টার শেলের শব্দে মাঝে মাঝে মাটি কেপে উঠত।এ রকম তিন চারদিন চলল।

 

একদিন রাতে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে নি:শ্বাসেও ঘুম ভাংগার মত নীরবতা। শিয়ালের ডাক নেই,পেচার প্রহর গননার আর্তনাদ ছিল না। সে এক রাতের নতুন নীরবতা।

সকাল হলো। রাতের নীরবতা ভেংগে,আঁধারের কাল রং ভেদ করে নতুন সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে দিবস এলো। আমরা ঘুম থেকে উঠে রোদ পোহাচ্ছিলাম। হঠাৎ কামারখালীর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে হেলিকপ্টার দেখলাম। সেগুলো উড়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছে।খবর পেলাম পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা ছুটে গেলাম হরিনা ডাংগা ঘাটে। ঘাটে তখন কামারখানীর আত্মসমর্পণকৃত সেনাও ছিল।লোকে গালিগালাজ করছে।ছেলেরা ওদেরকে বলছে বল,”জয় বাংলা “ওরা বলছে,” জুই বাংলা”।ভারতীয় আহত নিহত সেনা দেখেছি। দেখেছি পাকিস্তানের পরাজিত বিদ্ধস্ত সেনার বিষন্ন অবয়ব।ভারতীয় জয়ী সেনাদের মুখও যেন নিহতদের জন্য বিষন্ন ছিল।

কয়েক দিন পর কামারখালী হাটে গেলাম। ঘাটের ওপরের কোমর পুর গ্রামের মধ্যে খালের পাশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তার দু পাশের ট্রেন্সগুলি থেকে নিহত পাকিস্তানি হতভাগা সেনার পচা গলা লাশের রক্তে ভেজা মাটিও দেখলাম।তখনও নিহতের পচা গলা রক্ত বুজ বুজ করে মাটির উপরে উঠছে আর গন্ধ ছড়াচ্ছে।

বিজয় দেখেছি, বিজয়ের মূল্যও দিতে দেখেছি। যারা হারিয়েছে তারা সেদিনও বিষন্ন ছিল। বিজয়ের আনন্দে তারাই হেসেছে যাদের কেউ হারায়নি।সেদিন যারা হেসেছিল আজও তারাই হাসে।যাদের হারিয়েছে তারা আজও হাসেনা।বেদন ব্যাথায় বোবা।

আজকের এই বিজয়ের দিনে নিহতদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।