ঢাকা ১১:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা। সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা ও মতুয়া দর্শন: শাস্ত্র, ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা। ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, আত্মসমর্পণের ঘোষণা। মির্জাপুরে রাস্তার কাজে অনিয়ম, বিল আটকে দিলেন উপজেলা প্রকৌশলী মনিরুল সাজ রিজন। দুর্গম বন্যাকবলিত এলাকায় ভয়াবহ মানবিক সংকট, ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, কক্সবাজার জেলা শাখা। কাঁঠালিয়ায় বৃষ্টিতে ভেঙ্গে গেছে ঘর, গৃহহীন হতদরিদ্র পরিবার। ঠাকুরগাঁওয়ে একাই ৫২ হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন খোরশেদ আলী। চারঘাটে ৭ বছরের শিশু ধর্ষিত। সুনামগঞ্জের শাল্লায় চলন্ত নৌকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন, অভিযুক্ত যুবক গ্রেফতার। ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার সাগরে, আর ফেরা হলো না আক্কাসের।

সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা ও মতুয়া দর্শন: শাস্ত্র, ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা।

( প্রথম অধ্যায়ের পর)

দ্বিতীয় অধ্যায়

বেদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত ও রামায়ণের আলোকে সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা

২.১ ভূমিকা

সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা কোনো আধুনিক ধারণা নয়; এর ভিত্তি প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যেই নিহিত। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং রামায়ণ—সবকটিই মানবকল্যাণ, সত্য, ন্যায়, সহিষ্ণুতা, ভক্তি ও সর্বজনীন নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। তাই সনাতন ধর্মকে কেবল একটি আচারভিত্তিক ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি চিরন্তন জীবনদর্শন হিসেবেও দেখা হয়।

২.২ বেদের আলোকে বিশ্বজনীনতা

(ক) সত্য এক, প্রকাশ বহু ।ঋগ্বেদে বলা হয়েছে—

“একং সদ্ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি।”(ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৬)

অর্থাৎ, পরম সত্য এক, কিন্তু জ্ঞানীরা তাঁকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন।

এই মন্ত্র সনাতন ধর্মের ধর্মীয় উদারতার ভিত্তি। এখানে সত্যকে কোনো একটি ভাষা, জাতি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।

(খ) জ্ঞানের প্রতি উদারতা

ঋগ্বেদের আরেকটি বিখ্যাত মন্ত্র—

“আ নো ভদ্রাঃ ক্রতবো যন্তু বিশ্বতঃ।”(ঋগ্বেদ ১.৮৯.১)

অর্থাৎ—

বিশ্বের সব দিক থেকে কল্যাণকর চিন্তা আমাদের কাছে আসুক।

এটি দেখায় যে সনাতন ধর্ম জ্ঞান, যুক্তি ও শুভবুদ্ধিকে সর্বদা স্বাগত জানায়।

(গ) সমবেত অগ্রযাত্রা

ঋগ্বেদে আরও বলা হয়েছে—

“সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।”(ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২)

অর্থ—

একসঙ্গে চল, একসঙ্গে কথা বল, একসঙ্গে চিন্তা কর।

এই মন্ত্র সামাজিক ঐক্য ও সম্মিলিত উন্নয়নের শিক্ষা দেয়।

২.৩ পুরাণের আলোকে বিশ্বজনীনতা

পুরাণসমূহে ধর্মের মূল লক্ষ্য হিসেবে মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও ঈশ্বরভক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি বহুল উদ্ধৃত নীতি হলো—”পরোপকারায় পুণ্যায়, পাপায় পরপীড়নম্।”

অর্থ—

পরোপকারই পুণ্য, আর অন্যকে কষ্ট দেওয়াই পাপ।

এই নীতিই সনাতন ধর্মের সামাজিক নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি।

পুরাণে বহু স্থানে বলা হয়েছে যে ঈশ্বরের কাছে জাতি, বর্ণ বা সম্পদ নয়; ভক্তির আন্তরিকতাই মুখ্য।

২.৪ শ্রীমদ্ভাগবতের আলোকে বিশ্বজনীনতা

শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ-এ ভক্তিকে সর্বোচ্চ ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রথম স্কন্ধে বলা হয়েছে—

“স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।”(ভাগবত ১.২.৬)

অর্থ—

মানুষের সর্বোত্তম ধর্ম সেই, যা ভগবানের প্রতি নির্মল ভক্তি জাগ্রত করে।

এখানে কোথাও জাতি, জন্ম বা সামাজিক অবস্থানকে ধর্মের মাপকাঠি বলা হয়নি।

আবার সপ্তম স্কন্ধে প্রহ্লাদ-এর জীবনী দেখায় যে সত্যিকারের ভক্তি জন্মপরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; ঈশ্বর আন্তরিক ভক্তিকেই গ্রহণ করেন।

২.৫ রামায়ণের আলোকে বিশ্বজনীনতা

রামায়ণ-এ শ্রীরাম-কে “মর্যাদা পুরুষোত্তম” বলা হয়।

তিনি বনবাসকালে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমান মর্যাদায় সম্পর্ক স্থাপন করেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শবরী-র ভক্তি গ্রহণ।

হনুমান-এর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।বিভীষণ-কে আশ্রয় প্রদান।

এসব ঘটনা দেখায় যে ধর্মের প্রকৃত মূল্যায়ন চরিত্র, ভক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে; জন্ম বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

২.৬ বিশ্বজনীনতার মৌলিক স্তম্ভ

উপরোক্ত শাস্ত্রসমূহের আলোচনার ভিত্তিতে সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতার প্রধান স্তম্ভগুলো হলো—

১. সত্য এক, পথ বহু।

২. সকল মানুষের মর্যাদা সমান।

৩. ভক্তি জন্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

৪. পরোপকারই ধর্মের অন্যতম ভিত্তি।

৫. জ্ঞান, সহিষ্ণুতা ও যুক্তির প্রতি উন্মুক্ততা।

৬. সমগ্র বিশ্বকে এক পরিবার হিসেবে দেখা।

৭. ধর্মের লক্ষ্য মানবকল্যাণ ও আত্মমুক্তি।

২.৭ মতুয়া দর্শনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা

এই অধ্যায়ে আলোচিত শাস্ত্রীয় আদর্শগুলোর সঙ্গে মতুয়া দর্শনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ করা যায়। যেমন—

ঈশ্বরভক্তির ওপর জোর।

নামস্মরণের গুরুত্ব।

মানবসম্মান ও নৈতিক জীবন।

সমাজকল্যাণের প্রতি গুরুত্ব।

তবে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় কর্তৃত্বের উৎস, আচার-পদ্ধতি এবং ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। সেই বিষয়গুলো পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

২.৮ উপসংহার

বেদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং রামায়ণের আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি সংকীর্ণতা নয়, বরং সত্য, ভক্তি, ন্যায়, সহিষ্ণুতা ও বিশ্বমানবতার আদর্শ। এই শাস্ত্রীয় ভিত্তি বোঝা গেলে মতুয়া দর্শনের সঙ্গে এর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিচার করা আরও সহজ হয়।

( চলবে)

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা।

সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা ও মতুয়া দর্শন: শাস্ত্র, ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা।

আপডেট সময় : ০৮:২৯:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

( প্রথম অধ্যায়ের পর)

দ্বিতীয় অধ্যায়

বেদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত ও রামায়ণের আলোকে সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা

২.১ ভূমিকা

সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা কোনো আধুনিক ধারণা নয়; এর ভিত্তি প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যেই নিহিত। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং রামায়ণ—সবকটিই মানবকল্যাণ, সত্য, ন্যায়, সহিষ্ণুতা, ভক্তি ও সর্বজনীন নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। তাই সনাতন ধর্মকে কেবল একটি আচারভিত্তিক ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি চিরন্তন জীবনদর্শন হিসেবেও দেখা হয়।

২.২ বেদের আলোকে বিশ্বজনীনতা

(ক) সত্য এক, প্রকাশ বহু ।ঋগ্বেদে বলা হয়েছে—

“একং সদ্ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি।”(ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৬)

অর্থাৎ, পরম সত্য এক, কিন্তু জ্ঞানীরা তাঁকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন।

এই মন্ত্র সনাতন ধর্মের ধর্মীয় উদারতার ভিত্তি। এখানে সত্যকে কোনো একটি ভাষা, জাতি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।

(খ) জ্ঞানের প্রতি উদারতা

ঋগ্বেদের আরেকটি বিখ্যাত মন্ত্র—

“আ নো ভদ্রাঃ ক্রতবো যন্তু বিশ্বতঃ।”(ঋগ্বেদ ১.৮৯.১)

অর্থাৎ—

বিশ্বের সব দিক থেকে কল্যাণকর চিন্তা আমাদের কাছে আসুক।

এটি দেখায় যে সনাতন ধর্ম জ্ঞান, যুক্তি ও শুভবুদ্ধিকে সর্বদা স্বাগত জানায়।

(গ) সমবেত অগ্রযাত্রা

ঋগ্বেদে আরও বলা হয়েছে—

“সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।”(ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২)

অর্থ—

একসঙ্গে চল, একসঙ্গে কথা বল, একসঙ্গে চিন্তা কর।

এই মন্ত্র সামাজিক ঐক্য ও সম্মিলিত উন্নয়নের শিক্ষা দেয়।

২.৩ পুরাণের আলোকে বিশ্বজনীনতা

পুরাণসমূহে ধর্মের মূল লক্ষ্য হিসেবে মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও ঈশ্বরভক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি বহুল উদ্ধৃত নীতি হলো—”পরোপকারায় পুণ্যায়, পাপায় পরপীড়নম্।”

অর্থ—

পরোপকারই পুণ্য, আর অন্যকে কষ্ট দেওয়াই পাপ।

এই নীতিই সনাতন ধর্মের সামাজিক নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি।

পুরাণে বহু স্থানে বলা হয়েছে যে ঈশ্বরের কাছে জাতি, বর্ণ বা সম্পদ নয়; ভক্তির আন্তরিকতাই মুখ্য।

২.৪ শ্রীমদ্ভাগবতের আলোকে বিশ্বজনীনতা

শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ-এ ভক্তিকে সর্বোচ্চ ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রথম স্কন্ধে বলা হয়েছে—

“স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।”(ভাগবত ১.২.৬)

অর্থ—

মানুষের সর্বোত্তম ধর্ম সেই, যা ভগবানের প্রতি নির্মল ভক্তি জাগ্রত করে।

এখানে কোথাও জাতি, জন্ম বা সামাজিক অবস্থানকে ধর্মের মাপকাঠি বলা হয়নি।

আবার সপ্তম স্কন্ধে প্রহ্লাদ-এর জীবনী দেখায় যে সত্যিকারের ভক্তি জন্মপরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; ঈশ্বর আন্তরিক ভক্তিকেই গ্রহণ করেন।

২.৫ রামায়ণের আলোকে বিশ্বজনীনতা

রামায়ণ-এ শ্রীরাম-কে “মর্যাদা পুরুষোত্তম” বলা হয়।

তিনি বনবাসকালে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমান মর্যাদায় সম্পর্ক স্থাপন করেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শবরী-র ভক্তি গ্রহণ।

হনুমান-এর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।বিভীষণ-কে আশ্রয় প্রদান।

এসব ঘটনা দেখায় যে ধর্মের প্রকৃত মূল্যায়ন চরিত্র, ভক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে; জন্ম বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

২.৬ বিশ্বজনীনতার মৌলিক স্তম্ভ

উপরোক্ত শাস্ত্রসমূহের আলোচনার ভিত্তিতে সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতার প্রধান স্তম্ভগুলো হলো—

১. সত্য এক, পথ বহু।

২. সকল মানুষের মর্যাদা সমান।

৩. ভক্তি জন্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

৪. পরোপকারই ধর্মের অন্যতম ভিত্তি।

৫. জ্ঞান, সহিষ্ণুতা ও যুক্তির প্রতি উন্মুক্ততা।

৬. সমগ্র বিশ্বকে এক পরিবার হিসেবে দেখা।

৭. ধর্মের লক্ষ্য মানবকল্যাণ ও আত্মমুক্তি।

২.৭ মতুয়া দর্শনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা

এই অধ্যায়ে আলোচিত শাস্ত্রীয় আদর্শগুলোর সঙ্গে মতুয়া দর্শনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ করা যায়। যেমন—

ঈশ্বরভক্তির ওপর জোর।

নামস্মরণের গুরুত্ব।

মানবসম্মান ও নৈতিক জীবন।

সমাজকল্যাণের প্রতি গুরুত্ব।

তবে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় কর্তৃত্বের উৎস, আচার-পদ্ধতি এবং ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। সেই বিষয়গুলো পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

২.৮ উপসংহার

বেদ, পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং রামায়ণের আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি সংকীর্ণতা নয়, বরং সত্য, ভক্তি, ন্যায়, সহিষ্ণুতা ও বিশ্বমানবতার আদর্শ। এই শাস্ত্রীয় ভিত্তি বোঝা গেলে মতুয়া দর্শনের সঙ্গে এর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিচার করা আরও সহজ হয়।

( চলবে)