সম্প্রতি গোপালগঞ্জ আদালতের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুনানি চলাকালে এজলাসে দায়িত্বরত বিচারক সবুজ মিয়ার ছুড়ে দেওয়া একটি পেপার ওয়েট একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী, সাবিহার মাথায় আঘাত করে এবং তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে অতীতেও আইনজীবীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়ায় এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে এবং ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ ও আইনানুগ আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৫ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি বা ক্ষতির সম্মুখীন না করার নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আদালত এমন একটি স্থান, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য আচরণের প্রত্যাশা করেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। তবে স্বাধীনতার অর্থ জবাবদিহিহীনতা নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন সংরক্ষণ করতে হবে, তেমনি বিচারিক ক্ষমতার ব্যবহারও হতে হবে সংবিধান, আইন এবং বিচারিক নৈতিকতার সীমার মধ্যে। একজন বিচারকের মর্যাদা তাঁর পদমর্যাদার পাশাপাশি তাঁর সংযম, ধৈর্য, নিরপেক্ষতা এবং আচরণ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের বিচারকদের জন্য বিচারিক আচরণবিধি (Code of Judicial Conduct) প্রণীত হয়েছে। এই নীতিমালার মূল দর্শন হলো—বিচারককে এমন আচরণ করতে হবে, যাতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট থাকে। বিচারকের ব্যক্তিগত আচরণও এমন হওয়া উচিত, যা আদালতের মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং কোনোভাবেই ভয়, আতঙ্ক বা অসম্মানের পরিবেশ সৃষ্টি না করে।
যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে আদালতের ভেতরে বিচারকের আচরণের কারণে একজন আইনজীবী শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন, তবে বিষয়টি শুধু শৃঙ্খলাজনিত নয়; এটি বিচারিক নৈতিকতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রযোজ্য ফৌজদারি আইনের আলোচনার বিষয়ও হতে পারে। আবার যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বিচারকের সুনাম রক্ষাও রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। এ কারণেই নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
একটি আদালত ভয়ের স্থান নয়; এটি ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, সাক্ষী কিংবা আদালতের কর্মচারী—সকলের জন্য আদালতের পরিবেশ হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং পেশাগত সৌজন্যে পরিপূর্ণ। বিচারকের প্রতিটি আচরণ জনগণের মনে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি গঠন করে।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের অধীনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিষয়সমূহ পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলে বিচারকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিচার বিভাগের নিজস্ব মর্যাদা রক্ষারও অংশ।
বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়েও বড় একটি নৈতিক দায়িত্ব। জনগণ আদালতে যান ন্যায়বিচারের আশায়, ভয় বা অনিশ্চয়তার জন্য নয়। তাই বিচারকের স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সংযম, ন্যায়পরায়ণতা, জবাবদিহি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অপরিহার্য দায়িত্ব।
গোপালগঞ্জের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত যে ফলেই উপনীত হোক না কেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিচার বিভাগের মর্যাদা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়? এর উত্তর প্রতিহিংসা বা আবেগে নয়; বরং স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের শাসন, বিচারিক নৈতিকতার কঠোর অনুসরণ এবং সংবিধানের মূল্যবোধের প্রতি অবিচল আনুগত্যে নিহিত।
ন্যায়বিচারের মূল শক্তি শুধু রায়ে নয়, বরং বিচারকের আচরণেও প্রতিফলিত হয়। বিচারকের কলম যেমন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি তাঁর সংযম, ধৈর্য ও শালীন আচরণ বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অটুট রাখতে পারে।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 























