ঢাকা ০২:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার। অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি চাই। কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ। ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা? ১৫ আগস্ট: গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া। হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ৭ মাসে ৪৫২ জন আটক, খুশি সচেতন মহল। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। যশোরের বাঘারপাড়ায় পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ গ্রাম। রূপগঞ্জে দেবরের হামলায় ভাবী নিহত গ্রেফতার ৩।

ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

 

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল থাকবে, নাকি নিশান—একটি প্রতীককে ঘিরে আজ মতুয়া সমাজের একটি অংশে যে বাদানুবাদ, উত্তেজনা ও বিভাজনের আবহ তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুঃখজনক নয়; গভীরভাবে উদ্বেগজনকও। কারণ মতুয়া আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শেখায়—ভেদ নয়, ঐক্য; বিদ্বেষ নয়, মানবতা; আধিপত্য নয়, মর্যাদা ও সাম্যের পথেই মানুষের মুক্তি।

একটি মন্দিরের চূড়ায় কোন প্রতীক থাকবে, সেটি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। ধর্মীয় অনুভূতি, ঐতিহ্য, স্থানীয় রীতি কিংবা বিশ্বাসের প্রশ্নে ভিন্নমত অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ভিন্নমত যদি পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা, কটূক্তি কিংবা সংঘাতের জন্ম দেয়, তখন আমাদের থেমে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি সত্যিই মতুয়া আদর্শের পথেই আছি?

হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের উত্তরাধিকার কেবল কিছু আচার, প্রতীক কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তি ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাগরণ এবং মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের চেতনা। সেই মহৎ উত্তরাধিকারের সন্তানরা যদি আজ একটি প্রতীককে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তবে তার চেয়ে বেদনাদায়ক পরিহাস আর কী হতে পারে!

প্রতীক কি আদর্শের চেয়ে বড়?

ত্রিশূল একটি শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতীক। নিশানও কোনো কোনো মতুয়া পরিসরে ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেক পক্ষের নিজস্ব অনুভূতি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতীক মানুষকে একত্র করার জন্য; মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়।

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল উঠল কি নিশান উড়ল—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই মন্দিরের নিচে দাঁড়ানো মানুষগুলোর হৃদয়ে কি পরস্পরের জন্য ভালোবাসা আছে?

চূড়ায় নিশান উড়ল, কিন্তু হৃদয়ে যদি বিদ্বেষের কালো মেঘ জমে থাকে—তাহলে সেই নিশান আমাদের কী শিক্ষা দিল?

চূড়ায় ত্রিশূল স্থাপন হলো, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের সম্পর্ক যদি ভেঙে যায়—তাহলে সেই ত্রিশূলের শক্তি কোথায়?

ধর্মের সৌন্দর্য প্রতীকে নয়, মানুষের আচরণে।

এই বিভেদে লাভবান হবে কারা?

এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

মতুয়া সমাজের অভ্যন্তরীণ কোনো মতপার্থক্য যখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়, তখন সুযোগসন্ধানী ও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলো সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। যারা মতুয়া সমাজের ঐক্য চায় না, যারা মানুষের আবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়, তারা এই বিভাজনের আগুনে ঘি ঢালতে পারে।

আজ একটি মন্দিরের চূড়া নিয়ে বিরোধ; কাল হয়তো আরেকটি প্রতীক, পরশু আরেকটি বিষয়। এভাবেই ছোট ছোট বিভাজন একদিন একটি বৃহৎ সামাজিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই সাধারণ মতুয়া মানুষগুলো—যারা কোনো ক্ষমতার রাজনীতি বোঝেন না, কোনো গোষ্ঠীগত আধিপত্য চান না; শুধু তাঁদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষের আদর্শ নিয়ে শান্তিতে থাকতে চান।

যে বিভাজনে সাধারণ মানুষ কাঁদে, কিন্তু সুবিধাবাদীরা হাসে—সেই বিভাজন কখনো কোনো ধর্মীয় সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

এখনই দরকার সংলাপ

এই বিরোধের সমাধান কোনো পক্ষের পরাজয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। দরকার আলাপ, আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।

মন্দিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ, প্রবীণ মতুয়া ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ভক্তদের নিয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, প্রচলিত রীতি এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের অনুভূতি—সবকিছু বিবেচনা করে একটি সম্মানজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

কারও বিশ্বাসকে অপমান না করে, কারও অনুভূতিকে আঘাত না করে, যুক্তির ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে।

কারণ সমঝোতা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়।

হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের সামনে আমরা কী জবাব দেব?

একবার কল্পনা করুন—আজ যদি হরিচাঁদ ঠাকুর কিংবা গুরুচাঁদ ঠাকুর আমাদের সামনে এসে দাঁড়াতেন, আর দেখতেন তাঁদের উত্তরসূরিরা একটি প্রতীককে কেন্দ্র করে পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত—তাঁরা কি খুশি হতেন?

নাকি তাঁদের চোখে ভেসে উঠত গভীর বেদনা?

যে আন্দোলন মানুষকে আত্মমর্যাদা শিখিয়েছে, সেই আন্দোলনের মানুষ যদি পরস্পরকে অসম্মান করে, তাহলে আমরা কাকে জয় করলাম?

এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হারিয়ে দিলেও কি মতুয়া আদর্শ জয়ী হবে?

না।

সেদিন জয়ী হবে বিভাজন; পরাজিত হবে মতুয়া ঐক্য।

আসুন, আমরা একটু থামি

আজ তাই উভয় পক্ষের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান—একটু থামুন। উত্তেজনার ভাষা পরিহার করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি বন্ধ করুন। একে অপরকে প্রতিপক্ষ নয়, একই ঐতিহ্যের সন্তান হিসেবে দেখুন।

যে কথাটি মুখোমুখি বসে বলা যায়, সেটি কেন জনসমক্ষে অপমানের ভাষায় বলতে হবে?

যে সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলে হতে পারে, তার জন্য কেন সম্পর্ক নষ্ট হবে?

মনে রাখতে হবে, আজকের একটি কঠিন কথা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী বিভেদের বীজ হয়ে যেতে পারে।

প্রকৃত মতুয়া কারা?

প্রকৃত মতুয়া পরিচয় কেবল পোশাকে, প্রতীকে, স্লোগানে কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় নয়। প্রকৃত মতুয়া পরিচয় প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আচরণে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে, অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানে।

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল থাকুক—কেউ আপত্তি করবেন না; নিশান থাকুক—কেউ অপমানিত হবেন না। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, মতুয়া সমাজের হৃদয়ে যেন বিভেদের কোনো নিশান না ওড়ে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি প্রতীক নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে; কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কখনো ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে গ্রাস না করে।

শেষ কথা

আজকের এই বিতর্ককে আমরা যদি বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলাতে পারি, তাহলে এটিই হতে পারে মতুয়া সমাজের জন্য একটি শিক্ষা—কীভাবে মতপার্থক্যকে সংঘাতে নয়, সংলাপে রূপান্তর করা যায়।

আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস হয়তো একদিন কঠিন প্রশ্ন করবে—

হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের যে ঐক্যের উত্তরাধিকার আমরা পেয়েছিলাম, সেটি কি আমরা একটি প্রতীকের বিরোধে হারিয়ে ফেলেছিলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।

তাই আসুন, ত্রিশূল ও নিশানের বিতর্ককে বিদ্বেষের আগুনে পরিণত না করে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসি। মতের ভিন্নতা থাকুক, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব যেন না বাড়ে।

মন্দিরের চূড়ায় যে প্রতীকই থাকুক—মতুয়া সমাজের হৃদয়ে যেন উড়তে থাকে ঐক্যের নিশান।

কারণ ত্রিশূল বা নিশানের চেয়েও বড় আমাদের মানবতা; প্রতীকের চেয়েও বড় আমাদের ভ্রাতৃত্ব; আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে—হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মানবিক আদর্শ।

আজ মতুয়া সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো পক্ষের জয় নয়—সবার জয়, ঐক্যের জয়, আদর্শের জয়।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

আপডেট সময় : ০৯:২৭:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

 

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল থাকবে, নাকি নিশান—একটি প্রতীককে ঘিরে আজ মতুয়া সমাজের একটি অংশে যে বাদানুবাদ, উত্তেজনা ও বিভাজনের আবহ তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুঃখজনক নয়; গভীরভাবে উদ্বেগজনকও। কারণ মতুয়া আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শেখায়—ভেদ নয়, ঐক্য; বিদ্বেষ নয়, মানবতা; আধিপত্য নয়, মর্যাদা ও সাম্যের পথেই মানুষের মুক্তি।

একটি মন্দিরের চূড়ায় কোন প্রতীক থাকবে, সেটি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। ধর্মীয় অনুভূতি, ঐতিহ্য, স্থানীয় রীতি কিংবা বিশ্বাসের প্রশ্নে ভিন্নমত অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ভিন্নমত যদি পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা, কটূক্তি কিংবা সংঘাতের জন্ম দেয়, তখন আমাদের থেমে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি সত্যিই মতুয়া আদর্শের পথেই আছি?

হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের উত্তরাধিকার কেবল কিছু আচার, প্রতীক কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তি ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাগরণ এবং মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের চেতনা। সেই মহৎ উত্তরাধিকারের সন্তানরা যদি আজ একটি প্রতীককে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তবে তার চেয়ে বেদনাদায়ক পরিহাস আর কী হতে পারে!

প্রতীক কি আদর্শের চেয়ে বড়?

ত্রিশূল একটি শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতীক। নিশানও কোনো কোনো মতুয়া পরিসরে ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেক পক্ষের নিজস্ব অনুভূতি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতীক মানুষকে একত্র করার জন্য; মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়।

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল উঠল কি নিশান উড়ল—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই মন্দিরের নিচে দাঁড়ানো মানুষগুলোর হৃদয়ে কি পরস্পরের জন্য ভালোবাসা আছে?

চূড়ায় নিশান উড়ল, কিন্তু হৃদয়ে যদি বিদ্বেষের কালো মেঘ জমে থাকে—তাহলে সেই নিশান আমাদের কী শিক্ষা দিল?

চূড়ায় ত্রিশূল স্থাপন হলো, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের সম্পর্ক যদি ভেঙে যায়—তাহলে সেই ত্রিশূলের শক্তি কোথায়?

ধর্মের সৌন্দর্য প্রতীকে নয়, মানুষের আচরণে।

এই বিভেদে লাভবান হবে কারা?

এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

মতুয়া সমাজের অভ্যন্তরীণ কোনো মতপার্থক্য যখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়, তখন সুযোগসন্ধানী ও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলো সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। যারা মতুয়া সমাজের ঐক্য চায় না, যারা মানুষের আবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়, তারা এই বিভাজনের আগুনে ঘি ঢালতে পারে।

আজ একটি মন্দিরের চূড়া নিয়ে বিরোধ; কাল হয়তো আরেকটি প্রতীক, পরশু আরেকটি বিষয়। এভাবেই ছোট ছোট বিভাজন একদিন একটি বৃহৎ সামাজিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই সাধারণ মতুয়া মানুষগুলো—যারা কোনো ক্ষমতার রাজনীতি বোঝেন না, কোনো গোষ্ঠীগত আধিপত্য চান না; শুধু তাঁদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষের আদর্শ নিয়ে শান্তিতে থাকতে চান।

যে বিভাজনে সাধারণ মানুষ কাঁদে, কিন্তু সুবিধাবাদীরা হাসে—সেই বিভাজন কখনো কোনো ধর্মীয় সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

এখনই দরকার সংলাপ

এই বিরোধের সমাধান কোনো পক্ষের পরাজয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। দরকার আলাপ, আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।

মন্দিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ, প্রবীণ মতুয়া ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ভক্তদের নিয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, প্রচলিত রীতি এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের অনুভূতি—সবকিছু বিবেচনা করে একটি সম্মানজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

কারও বিশ্বাসকে অপমান না করে, কারও অনুভূতিকে আঘাত না করে, যুক্তির ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে।

কারণ সমঝোতা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়।

হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের সামনে আমরা কী জবাব দেব?

একবার কল্পনা করুন—আজ যদি হরিচাঁদ ঠাকুর কিংবা গুরুচাঁদ ঠাকুর আমাদের সামনে এসে দাঁড়াতেন, আর দেখতেন তাঁদের উত্তরসূরিরা একটি প্রতীককে কেন্দ্র করে পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত—তাঁরা কি খুশি হতেন?

নাকি তাঁদের চোখে ভেসে উঠত গভীর বেদনা?

যে আন্দোলন মানুষকে আত্মমর্যাদা শিখিয়েছে, সেই আন্দোলনের মানুষ যদি পরস্পরকে অসম্মান করে, তাহলে আমরা কাকে জয় করলাম?

এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হারিয়ে দিলেও কি মতুয়া আদর্শ জয়ী হবে?

না।

সেদিন জয়ী হবে বিভাজন; পরাজিত হবে মতুয়া ঐক্য।

আসুন, আমরা একটু থামি

আজ তাই উভয় পক্ষের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান—একটু থামুন। উত্তেজনার ভাষা পরিহার করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি বন্ধ করুন। একে অপরকে প্রতিপক্ষ নয়, একই ঐতিহ্যের সন্তান হিসেবে দেখুন।

যে কথাটি মুখোমুখি বসে বলা যায়, সেটি কেন জনসমক্ষে অপমানের ভাষায় বলতে হবে?

যে সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলে হতে পারে, তার জন্য কেন সম্পর্ক নষ্ট হবে?

মনে রাখতে হবে, আজকের একটি কঠিন কথা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী বিভেদের বীজ হয়ে যেতে পারে।

প্রকৃত মতুয়া কারা?

প্রকৃত মতুয়া পরিচয় কেবল পোশাকে, প্রতীকে, স্লোগানে কিংবা আনুষ্ঠানিকতায় নয়। প্রকৃত মতুয়া পরিচয় প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আচরণে, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে, অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানে।

মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল থাকুক—কেউ আপত্তি করবেন না; নিশান থাকুক—কেউ অপমানিত হবেন না। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, মতুয়া সমাজের হৃদয়ে যেন বিভেদের কোনো নিশান না ওড়ে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি প্রতীক নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে; কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কখনো ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে গ্রাস না করে।

শেষ কথা

আজকের এই বিতর্ককে আমরা যদি বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলাতে পারি, তাহলে এটিই হতে পারে মতুয়া সমাজের জন্য একটি শিক্ষা—কীভাবে মতপার্থক্যকে সংঘাতে নয়, সংলাপে রূপান্তর করা যায়।

আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস হয়তো একদিন কঠিন প্রশ্ন করবে—

হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের যে ঐক্যের উত্তরাধিকার আমরা পেয়েছিলাম, সেটি কি আমরা একটি প্রতীকের বিরোধে হারিয়ে ফেলেছিলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।

তাই আসুন, ত্রিশূল ও নিশানের বিতর্ককে বিদ্বেষের আগুনে পরিণত না করে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসি। মতের ভিন্নতা থাকুক, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব যেন না বাড়ে।

মন্দিরের চূড়ায় যে প্রতীকই থাকুক—মতুয়া সমাজের হৃদয়ে যেন উড়তে থাকে ঐক্যের নিশান।

কারণ ত্রিশূল বা নিশানের চেয়েও বড় আমাদের মানবতা; প্রতীকের চেয়েও বড় আমাদের ভ্রাতৃত্ব; আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে—হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মানবিক আদর্শ।

আজ মতুয়া সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো পক্ষের জয় নয়—সবার জয়, ঐক্যের জয়, আদর্শের জয়।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা।