একটি ছবি কখনো কখনো হাজারো শব্দের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে। একটি ছবিই পারে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে, সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে এক মা তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ছুটে চলেছেন। সন্তানের মাথার ওপর নিজের হাত রেখে, নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে তিনি যেন পৃথিবীর সমস্ত বিপদ থেকে শিশুটিকে আড়াল করতে চাইছেন। তাঁর পিঠে স্কুলব্যাগ, গায়ে সাধারণ শাড়ি, পায়ে স্যান্ডেল—কিন্তু বুকের ভেতর যে সাহস, তা কোনো অস্ত্রের চেয়ে কম নয়।
ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও মায়ের বুকই সন্তানের শেষ আশ্রয়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে—একটি শিশুকে কেন এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে? কেন একটি মাকে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য নিজের শরীরকে দুর্গের প্রাচীর বানাতে হবে?
মায়ের মমতা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি
মাতৃত্বের কোনো সংজ্ঞা নেই। সন্তানের বিপদে মা নিজের জীবনকেও তুচ্ছ করতে পারেন—এ সত্য মানবসভ্যতার ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু মায়ের এই আত্মত্যাগকে কেবল আবেগের চোখে দেখলে ছবিটির গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
একটি শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা তার মৌলিক অধিকার। শিক্ষা গ্রহণ, খেলাধুলা, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং ভয়হীন পরিবেশে চলাফেরা করার অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। অথচ যখন সংঘাত, সহিংসতা কিংবা অস্থিরতা একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, তখন সেই অধিকারই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
যে শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও রঙিন পেনসিল, সে যদি ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়, তবে তার দায় শুধু পরিস্থিতির নয়—আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতারও।
সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা
যেকোনো সংঘাতের প্রথম আঘাত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। আর সেই আঘাতের সবচেয়ে অসহায় শিকার শিশুরা। তারা সংঘাত সৃষ্টি করে না, কোনো পক্ষের হয়ে লড়াই করে না, ক্ষমতার হিসাব বোঝে না। তবু তাদেরই হারাতে হয় নিরাপত্তা, স্বাভাবিক শৈশব এবং কখনো কখনো প্রিয়জনদের।
একটি শিশুর মনে ভয়ের যে ক্ষত তৈরি হয়, তা দৃশ্যমান ক্ষতের চেয়েও গভীর হতে পারে। বিস্ফোরণের শব্দ, আতঙ্কিত মানুষের ছুটে চলা কিংবা প্রিয়জনের উদ্বিগ্ন মুখ—এসব স্মৃতি তার মানসিক বিকাশকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করতে পারে।
তাই সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের সময় শুধু প্রাণহানি কিংবা সম্পদের হিসাব করলেই চলবে না। হিসাব করতে হবে কত শিশুর শৈশব হারিয়ে গেল, কত মায়ের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া হলো, কত পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
মানবিকতার কাছে পরাজিত হোক হিংসা
ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হলো—মানুষের মধ্যে বিভেদ থাকতে পারে, মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু শিশুর নিরাপত্তা ও মায়ের মমতার প্রশ্নে কোনো বিভেদ গ্রহণযোগ্য নয়।
ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জাতীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যে শিশুটি আজ মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে আছে, তার পরিচয় কোনো পক্ষের নয়; সে মানবতার সন্তান।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের ময়দানে বিজয়ী পক্ষ থাকলেও মানবিকতার পরাজয় হলে সেই বিজয় কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। যে সমাজ শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ উন্নয়নের যত বড় দাবিই করুক, তার অগ্রযাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।
মায়ের বুকের বদলে রাষ্ট্র হোক নিরাপত্তার দেয়াল
ছবির সেই মা তাঁর সন্তানকে রক্ষা করতে নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছেন। তাঁর এই মমতা আমাদের শ্রদ্ধায় নত করে। কিন্তু কোনো শিশুর নিরাপত্তা কেবল তার মায়ের সাহসের ওপর নির্ভর করতে পারে না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো মাকে সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের শরীরকে ঢাল বানাতে না হয়।
রাষ্ট্রকে হতে হবে শিশুদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, সমাজকে হতে হবে তাদের আশ্রয়, আর মানুষের বিবেককে হতে হবে অন্যায় ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।
আজকের এই ছবি আমাদের সামনে এক গভীর মানবিক প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি এমন একটি পৃথিবী গড়তে পেরেছি, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে পারে?
যদি না পেরে থাকি, তবে আমাদের উন্নয়ন, সভ্যতা ও মানবিকতার সব দাবি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মায়ের বুক সন্তানের চিরন্তন আশ্রয়। কিন্তু সেই বুক যেন কখনো যুদ্ধের ঢাল হতে বাধ্য না হয়। প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী। 




















