একাত্তরে পাকবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিতে হয় বাংলাদেশের অগণন মানুষকে। মানবিক সংকট ঠেকাতে সীমান্তে দ্বার খুলে দেয় ভারত।দেশের ভেতরে দখলদার বাহিনীর বর্বরতা যত তীব্র হয়, সীমান্তের ওপারে শরণার্থীদের ভীড় তত বাড়ে। অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে শরণার্থী হতে হয় দেশের প্রায় এক কোটি মানুষকে। যা সেসময়ের নিউজিল্যান্ড ও সুইডেনের মোট জনসংখ্যার সমান।
গণহত্যা শুরুর তিন সপ্তাহ পর, কলকাতার ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়- ত্রিশ হাজার শরণার্থীর সীমান্ত পাড়ি দেয়ার খবর প্রকাশিত হয়। জুন মাসের মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই পৌঁছে যায় প্রায় পৌণে তেতাল্লিশ লক্ষ শরণার্থী। ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ লিখেছিলেন- ‘পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরেই আশি লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, যারা দিশেহারা হয়ে মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে পথ খুঁজছে।’ কিন্তু বাচাঁর সেই পথও ছিল রক্তমাখা। ২০ মে, খুলনার চুকনগরে সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রারত প্রায় দশ হাজার নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাকবাহিনী। এপ্রিল-মে মাস জুড়ে শরণার্থী যাত্রাপথে এমন পরিকল্পিত হত্যাকা- ঘটে অসংখ্য জায়গায়।
মে ও জুন মাসে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা। গবেষণায় দেখা যায়, একাত্তরে শুধু কলেরা মহামারিতেই প্রাণ হারায় তিন লাখ সতেরো হাজারেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে দুই লাখ সাঁইত্রিশ হাজারের বেশি ছিল শিশু। জুনের শুরুতে মৃত্যুর সেই নির্মম দৃশ্য তুলে ধরেন মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শেনবার্গ। তিনি লিখেছিলেন- ‘আসামের সীমান্তবর্তী এক শহরে, কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক মায়ের নিথর দেহ আঁকড়ে তার দুধের শিশু তখনও স্তনপান করে চলেছে। চিকিৎসক এসে মৃত মায়ের কোল থেকে শিশুটিকে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সে বুঝতেই পারেনি, তার পৃথিবী ইতোমধ্যে শূন্য হয়ে গেছে।’
আগস্ট মাসে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। বিদায়ের সময় তিনি বলেন- ‘এ আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি। এই বেদনার গভীরতা না দেখলে, কেবল শুনে তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।’ মাদার তেরেসাও বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে লিখেছিলেন- ‘পৃথিবীকে আবারও বলছি, অবশ্যই উদ্বিগ্ন হতে হবে। লক্ষ লক্ষ শিশু অপুষ্টি ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগছে’।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরেবেড়ান। ভবঘুরে এই করি নভেম্বর মাসে নিউইয়র্ক ফিরে গিয়ে রচনা করেন- ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। সুদীর্ঘ এই কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে একাত্তরের মহাকাব্যিক আর্তনাদ। নভেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জার্মানিতে এক সভায় বলেন, প্রায় সাতানব্বই লক্ষ বাংলাদেশি শরণার্থী ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের দলিলে উল্লেখ করা হয়, ভারতের ৮২৯টি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় নিরানব্বই লাখ মানুষ। আমাদের উচিত ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া। ইতিহাস বিকৃতির শাস্তি বড় নির্মম বড় কঠিন। আগামীর প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। সঠিক ইতিহাস চর্চা জাতিকে উন্নয়নের সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে। ইতিহাসের সবচাইতে বড় শিক্ষা এই যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। এজন্যই বারবার ইতিহাস রচিত হয়। History repeated again and again।
সারাক্ষণ ডেস্ক
সারাক্ষণ ডেস্ক 
























