ঢাকা ০১:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা। সনাতন ধর্মের বিশ্বজনীনতা ও মতুয়া দর্শন: শাস্ত্র, ইতিহাস ও দর্শনের আলোকে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা। ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, আত্মসমর্পণের ঘোষণা। মির্জাপুরে রাস্তার কাজে অনিয়ম, বিল আটকে দিলেন উপজেলা প্রকৌশলী মনিরুল সাজ রিজন। দুর্গম বন্যাকবলিত এলাকায় ভয়াবহ মানবিক সংকট, ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, কক্সবাজার জেলা শাখা। কাঁঠালিয়ায় বৃষ্টিতে ভেঙ্গে গেছে ঘর, গৃহহীন হতদরিদ্র পরিবার। ঠাকুরগাঁওয়ে একাই ৫২ হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন খোরশেদ আলী। চারঘাটে ৭ বছরের শিশু ধর্ষিত। সুনামগঞ্জের শাল্লায় চলন্ত নৌকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন, অভিযুক্ত যুবক গ্রেফতার। ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার সাগরে, আর ফেরা হলো না আক্কাসের।
অপরাধীর বিচার আদালতে, জনতার হাতে নয়।

গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা।

 

সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো আইনের শাসন। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে অপরাধের বিচার একটি নিরপেক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। কিন্তু যখন গুজবের ভিত্তিতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করে, তখন সেই আস্থা ভেঙে পড়ে। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় গ্রেফতারকৃত এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে থানা আক্রমণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।

ঘটনাটিকে শুধু একটি স্থানীয় বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় সামাজিক সমস্যা—গুজবনির্ভর আবেগ, বিচারব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস এবং মব সংস্কৃতির বিস্তার। একটি গুজব কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে, কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত।

অপরাধী যত বড় অপরাধের সঙ্গেই জড়িত থাকুক না কেন, তার বিচার করার অধিকার রাষ্ট্রের। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে, আদালত বিচার করবেন। এটাই সভ্যতার নিয়ম। কিন্তু কোনো অভিযোগের কারণে কাউকে ঘিরে জনতার রায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুধু বেআইনি নয়, এটি ন্যায়বিচারের মূল ধারণার বিরোধী।

মাদক ব্যবসা, চুরি কিংবা অন্যান্য অপরাধ সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে যদি নতুন করে অপরাধ সৃষ্টি হয়, তাহলে সমাজে শৃঙ্খলা নয়, বিশৃঙ্খলাই প্রতিষ্ঠিত হবে। যারা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে, তাদের উদ্দেশ্যও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় অপরাধী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে।

থানা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের কেন্দ্র। সেখানে হামলা করা মানে শুধু কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে আক্রমণ করা নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর ওপর আঘাত করা। পুলিশ সদস্যদের কাজের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকলে তার প্রতিকার রয়েছে—আইনি অভিযোগ, তদন্ত ও বিচারিক ব্যবস্থা। কিন্তু হামলা, ভাঙচুর বা সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বর্তমান সময়ে গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যাচাইহীন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেকেই তথ্য যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন। এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একটি মিথ্যা তথ্যের পরিণতি কখনো কখনো প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, একটি গুজব ছড়ানো শুধু মতপ্রকাশের বিষয় নয়; যদি তা সহিংসতা উসকে দেয়, তবে তা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে গুজব প্রতিরোধে প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো গ্রেফতার, হেফাজত বা আইনগত ঘটনার বিষয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্যের ঘাটতি থাকলে গুজবের সুযোগ তৈরি হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে পারলে জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।

মব সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। জনতার শক্তি যখন আইন ও যুক্তির সীমা অতিক্রম করে সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন সেখানে ন্যায়বিচার থাকে না; থাকে কেবল বিশৃঙ্খলা। আজ যদি গুজবের ভিত্তিতে একজন অভিযুক্তকে কেন্দ্র করে থানা আক্রান্ত হয়, আগামী দিনে এর শিকার হতে পারেন যে কেউ।

তাই এখনই সময়—গুজব, উসকানি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। রাষ্ট্রকে যেমন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে, তেমনি জনগণকেও বুঝতে হবে যে ন্যায়বিচারের পথ হলো আদালত, রাস্তায় উত্তেজিত জনতার বিচার নয়।

একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়তে হলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, সত্য তথ্যের প্রতি আস্থা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর বিচার হবে আদালতে, জনতার হাতে নয়—এই নীতিই হোক আমাদের সমাজের স্থায়ী অঙ্গীকার।

কারণ গুজবের আগুন কখনো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে পোড়ায় না; এটি পুড়িয়ে দেয় সমাজের শান্তি, আস্থা ও ভবিষ্যৎ।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা।

অপরাধীর বিচার আদালতে, জনতার হাতে নয়।

গুজব, মব ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা: এখনই থামাতে হবে আইনের বাইরে বিচারের প্রবণতা।

আপডেট সময় : ০৯:১৬:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

 

সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো আইনের শাসন। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে অপরাধের বিচার একটি নিরপেক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। কিন্তু যখন গুজবের ভিত্তিতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করে, তখন সেই আস্থা ভেঙে পড়ে। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় গ্রেফতারকৃত এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে থানা আক্রমণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমাদের সামনে সেই কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।

ঘটনাটিকে শুধু একটি স্থানীয় বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় সামাজিক সমস্যা—গুজবনির্ভর আবেগ, বিচারব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস এবং মব সংস্কৃতির বিস্তার। একটি গুজব কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে, কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণের মুখে ফেলতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত।

অপরাধী যত বড় অপরাধের সঙ্গেই জড়িত থাকুক না কেন, তার বিচার করার অধিকার রাষ্ট্রের। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে, আদালত বিচার করবেন। এটাই সভ্যতার নিয়ম। কিন্তু কোনো অভিযোগের কারণে কাউকে ঘিরে জনতার রায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুধু বেআইনি নয়, এটি ন্যায়বিচারের মূল ধারণার বিরোধী।

মাদক ব্যবসা, চুরি কিংবা অন্যান্য অপরাধ সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে যদি নতুন করে অপরাধ সৃষ্টি হয়, তাহলে সমাজে শৃঙ্খলা নয়, বিশৃঙ্খলাই প্রতিষ্ঠিত হবে। যারা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে, তাদের উদ্দেশ্যও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় অপরাধী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে।

থানা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের কেন্দ্র। সেখানে হামলা করা মানে শুধু কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে আক্রমণ করা নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর ওপর আঘাত করা। পুলিশ সদস্যদের কাজের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকলে তার প্রতিকার রয়েছে—আইনি অভিযোগ, তদন্ত ও বিচারিক ব্যবস্থা। কিন্তু হামলা, ভাঙচুর বা সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বর্তমান সময়ে গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যাচাইহীন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেকেই তথ্য যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন। এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একটি মিথ্যা তথ্যের পরিণতি কখনো কখনো প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, একটি গুজব ছড়ানো শুধু মতপ্রকাশের বিষয় নয়; যদি তা সহিংসতা উসকে দেয়, তবে তা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে গুজব প্রতিরোধে প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো গ্রেফতার, হেফাজত বা আইনগত ঘটনার বিষয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্যের ঘাটতি থাকলে গুজবের সুযোগ তৈরি হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে পারলে জনগণের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।

মব সংস্কৃতি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। জনতার শক্তি যখন আইন ও যুক্তির সীমা অতিক্রম করে সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন সেখানে ন্যায়বিচার থাকে না; থাকে কেবল বিশৃঙ্খলা। আজ যদি গুজবের ভিত্তিতে একজন অভিযুক্তকে কেন্দ্র করে থানা আক্রান্ত হয়, আগামী দিনে এর শিকার হতে পারেন যে কেউ।

তাই এখনই সময়—গুজব, উসকানি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। রাষ্ট্রকে যেমন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে, তেমনি জনগণকেও বুঝতে হবে যে ন্যায়বিচারের পথ হলো আদালত, রাস্তায় উত্তেজিত জনতার বিচার নয়।

একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়তে হলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, সত্য তথ্যের প্রতি আস্থা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর বিচার হবে আদালতে, জনতার হাতে নয়—এই নীতিই হোক আমাদের সমাজের স্থায়ী অঙ্গীকার।

কারণ গুজবের আগুন কখনো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে পোড়ায় না; এটি পুড়িয়ে দেয় সমাজের শান্তি, আস্থা ও ভবিষ্যৎ।