বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের কর্ম, নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করেছে। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকার তাঁদেরই একজন। তিনি একজন খ্যাতিমান আইনজীবী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ–রাণীশংকৈল) আসনের রাজনীতি ও উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চারিত হয়।
আইন পেশায় সুনাম অর্জনের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করলেও ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকার পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসাধারণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে এবং জাতীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকারও সেই সময়কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতাদের একজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি জাতীয় সংসদে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের প্রতিনিধিত্ব করে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হাই বলেন, “আমরা যখন তরুণ ছিলাম, তখন এলাকার রাস্তা-ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে ছিল। জমিরউদ্দীন সরকার সংসদ সদস্য হওয়ার পর এসব বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এলাকার উন্নয়নে তাঁর আন্তরিকতা মানুষ এখনও মনে রেখেছে।”
পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষক নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, “তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, শিক্ষাবান্ধব মানুষও ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান নিয়ে অনেকেই আজও আলোচনা করেন।”
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, স্থানীয় নেতৃত্বের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া কোনো অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক অগ্রগতিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকারের রাজনৈতিক জীবনও সেই ধারার একটি অংশ। তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন প্রশ্নে জাতীয় পর্যায়ে বারবার সোচ্চার ছিলেন।
রাণীশংকৈল উপজেলার ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তিনি সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন। এলাকার সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে গেলে গুরুত্ব দিতেন। এ কারণেই মানুষ তাঁকে দীর্ঘদিন সমর্থন করেছে।”
রাজনীতিতে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়েও একটি পরিচিত মুখে পরিণত করে।
পীরগঞ্জের বাসিন্দা রওশন আরা বেগম বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম হয়তো তাঁকে কাছ থেকে দেখেনি, কিন্তু আমাদের প্রজন্ম তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখেছে। এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিক।”
রাজনীতির ইতিহাসে একজন নেতার মূল্যায়ন কেবল তাঁর পদ-পদবির মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের স্মৃতিতে তাঁর অবস্থানের মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকার সেই অর্থে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইনজীবী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক সংগঠক—প্রতিটি পরিচয়ে তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
আজও ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ও রাণীশংকৈল অঞ্চলের রাজনৈতিক আলোচনা, উন্নয়নের ইতিহাস কিংবা নেতৃত্বের মূল্যায়নে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দীন সরকারের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















