ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসাহক আলীর বিরুদ্ধে সরকারি বই ও খাতা গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই তিনি বিপুল পরিমাণ সরকারি বই ও খাতা এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।
গত ১৩ জুলাই (সোমবার) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চন্ডিপুর ভাঙারি ব্যবসায়ী মোঃ নুরে আলমকে (পিতা: মৃত সিরাজুল ইসলাম) মুঠোফোনে ডেকে এনে এই বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক ইসাহক আলী সরকারি নিয়ম ভাঙার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে মোট ১ হাজার ৯৫ কেজি ওজনের সরকারি বই ও খাতা বিক্রি করেন। যার বিবরণ নিম্নরূপ:
সরকারি বই ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ ৭ শত ২৫ কেজি ২১ টাকা দরে বিক্রি করেন।
খাতা (উত্তরপত্র/অন্যান্য)-৩ শত ৭০ কেজি ৩৩ টাকা দরে বিক্রি করেন।
সরকারি বই ও সম্পত্তি বিক্রির আইনি নিয়ম
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বা পুরাতন সরকারি বই এবং খাতা বিক্রির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সরকারি কোনো মালামাল এভাবে সরাসরি বা গোপনে ব্যক্তি উদ্যোগে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষা অফিসকে অবহিতকরণ: যেকোনো সরকারি শিক্ষা সামগ্রী বিনষ্ট বা বিক্রি করতে হলে সর্বাগ্রে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে লিখিতভাবে অবহিত করতে হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সমন্বয়ে গঠিত একটি সরকারি কমিটির মাধ্যমে উক্ত মালামাল মূল্যায়ন করতে হয়।
মূল্যায়ন শেষে সরকারি নিয়ম মেনে উন্মুক্ত দরপত্র বা নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে সরকারি মালামাল বিক্রি করতে হয়।
নিলাম থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ চালানের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।
এই সমস্ত নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসাহক আলী ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এই সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসাহক আলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে সরকারি নিয়ম ভঙ্গ ও বই বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে পরে কিছুটা সুর নরম করে তিনি বলেন:
“হ্যাঁ, প্রতিষ্ঠান থেকে গতকাল কিছু খাতা বিক্রি করা হয়েছে তা আমি জানি। তবে তার ভেতর সরকারি বই ছিল কি না, তা আমার জানা নেই। খাতা বিক্রির বিষয়ে আমি কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলাম। কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে ভেতরে বই ছিল কি না।”
একথা বলেই তিনি তড়িঘড়ি করে ফোনটি কেটে দেন, যা তার দায়িত্বহীনতা ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—প্রধান শিক্ষকের লিখিত অনুমতি বা নির্দেশ ছাড়া কীভাবে একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী স্কুল প্রাঙ্গণে ঢুকে ১ হাজার কেজির ওপর মালামাল আলমসাধুতে করে নিয়ে যেতে পারেন?
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কোটচাঁদপুরের স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে বলেন:
“সরকারি বই ও খাতা রাষ্ট্রের সম্পদ। এগুলো গরিব শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার স্বার্থে সরকার বিনামূল্যে বিতরণ করে। প্রধান শিক্ষক যেভাবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে, চোরের মতো গোপনে ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে সরকারি বই বিক্রি করে দিলেন, তা চরম নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে জাতি এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড আশা করে না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
এই বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপা রানী সরকার জানান:
“সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী স্কুলের যেকোনো বাতিল খাতা বা বই বিক্রি করতে হলে অবশ্যই শিক্ষা অফিসকে লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে এবং সরকারি নিলাম কমিটির মাধ্যমে তা করতে হবে। কোটচাঁদপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বই বা খাতা বিক্রির বিষয়ে আমাদের কোনো কিছু জানানো হয়নি বা অনুমতি নেওয়া হয়নি। ঘটনাটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও সরকারি নিয়ম বহির্ভূত কাজ। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছি এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সরকারি সম্পদ আত্মসাতের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে কোটচাঁদপুর জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপই এখন স্থানীয়দের একমাত্র দাবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















