ঢাকা ০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার। অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি চাই। কালকিনিতে ককটেল বিস্ফোরণে মাদ্রাসার ৬ শিক্ষার্থী আহত, একজন ঢাকায় প্রেরণ। ফেল করেছে শিক্ষার্থী, নাকি ফেল করেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা? ১৫ আগস্ট: গণতন্ত্রের আপসহীন কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া। হিলিতে মাদক নিয়ন্ত্রনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ৭ মাসে ৪৫২ জন আটক, খুশি সচেতন মহল। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের জালে বানারীপাড়ার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। যশোরের বাঘারপাড়ায় পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ গ্রাম। রূপগঞ্জে দেবরের হামলায় ভাবী নিহত গ্রেফতার ৩।
পেছনে ফ্যানের বাতাস, অথচ মুখে ‘বিদ্যুৎ চাই’—এই রাজনীতি কি আর চলতে পারে?

অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি চাই।

 

রাজনীতি শুধু ক্ষমতার মসনদ দখলের লড়াই নয়। রাজনীতি মানুষের স্বপ্ন, মানুষের কান্না, মানুষের ক্ষুধা, মানুষের অন্ধকার ঘর আর আগামী দিনের আশার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক মহৎ দায়িত্ব। যে রাজনীতি মানুষের জীবনকে সহজ করে না, মানুষের দুর্ভোগের পাশে দাঁড়ায় না, সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল স্লোগানের রাজনীতি হয়ে যায়।

আজ বাংলাদেশের মানুষ সেই পুরোনো স্লোগানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা আর শুধু শুনতে চায় না—“সরকার ব্যর্থ”, “সব শেষ”, “কিছুই হচ্ছে না।” তারা জানতে চায়—তাহলে সমাধান কী?

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। তিনি বলেছেন—তিন মাস নয়, ছয় মাসের মধ্যে দেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধানের মতো কোনো কার্যকর পরিকল্পনা যদি বিরোধী দলের কাছে থাকে, তা সংসদে উপস্থাপন করা হোক। সরকারের পরিকল্পনার চেয়ে ভালো হলে সেই পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হবে।

এই বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছে।

আমরা কি শুধু অভিযোগ করতে চাই, নাকি দেশকে বাঁচানোর মতো বিকল্প পথও দেখাতে চাই?

বিদ্যুৎ নেই—অভিযোগ সত্য হলে সরকারকে জবাব দিতে হবে। জ্বালানি সংকট আছে—কেন আছে, তার ব্যাখ্যা সরকারকেই দিতে হবে। মানুষের ঘর অন্ধকার হলে সেই অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু একই সঙ্গে বিরোধী দলের কাছেও জনগণের প্রশ্ন আছে—আপনারা ক্ষমতায় গেলে কী করবেন?

শুধু বলবেন না, “সরকার পারেনি।”

বলুন—“আমরা পারব কীভাবে।”

শুধু বলবেন না, “বিদ্যুৎ সংকট।”

বলুন—“সংকট সমাধানের আমাদের পরিকল্পনা হলো এটি।”

শুধু বলবেন না, “জ্বালানির দাম বেশি।”

বলুন—“দাম কমাতে, সরবরাহ বাড়াতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে আমরা এই পদক্ষেপ নেব।”

এটাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে আসছে—কে বেশি জোরে অন্য পক্ষকে ব্যর্থ বলতে পারে। কিন্তু জনগণ এখন সেই প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত। তারা চায় না কে কাকে হারাল; তারা জানতে চায় দেশ কে জিতাবে।

একজন কৃষক যখন সেচের জন্য বিদ্যুৎ পান না, তার কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতার মূল্য কতটুকু?

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে ব্যবসা চালাতে পারেন না, তার কাছে দলীয় স্লোগানের অর্থ কী?

একজন মা যখন সন্তানের পড়ার সময় অন্ধকার ঘরে বসে থাকেন, তখন তিনি সরকারের ব্যর্থতা কিংবা বিরোধী দলের অভিযোগ—কোনোটিই শুনতে চান না। তিনি চান তার সন্তানের বইয়ের পাতায় আলো জ্বলুক।

সেই আলো জ্বালানোর রাজনীতিই আমাদের প্রয়োজন।

সমালোচনা হোক, কিন্তু সমাধানও আসুক

বিরোধী দলের কাজ সরকারের সমালোচনা করা—এটি গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমালোচনা আর অপপ্রচার এক নয়।

তথ্যভিত্তিক সমালোচনা সরকারকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। যুক্তিনির্ভর বিরোধিতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সংসদে কঠিন প্রশ্ন করা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু মিথ্যা তথ্য, অর্ধসত্য, অতিরঞ্জন কিংবা জনগণের আবেগকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।

আবার সরকারের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। জনগণের প্রতিটি অভিযোগকে “অপপ্রচার” বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। জনগণের কষ্টকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে পাশ কাটানো যাবে না। বিদ্যুৎ নেই—তাহলে কেন নেই, জবাব দিতে হবে। জ্বালানি সংকট আছে—সমাধানের সময়সীমা জানাতে হবে। জনগণকে শুধু আশ্বাস নয়, পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিতে হবে।

কারণ গণতন্ত্রে জনগণই শেষ বিচারক।

বিরোধী দল কি বিকল্প সরকার হতে প্রস্তুত?

একটি শক্তিশালী বিরোধী দল শুধু সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে না; সে নিজেকে ভবিষ্যৎ সরকার হিসেবে প্রস্তুত করে।

অর্থনীতি কীভাবে চলবে—তার পরিকল্পনা থাকতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—তার রূপরেখা থাকতে হবে।

কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে—তার হিসাব থাকতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কী পরিবর্তন আসবে—তার নীতি থাকতে হবে।

দুর্নীতি কীভাবে কমবে—তার বাস্তব ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রশাসন কীভাবে জনবান্ধব হবে—তার কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।

অর্থাৎ জনগণ এখন জানতে চায়—“আপনারা সরকারের সমালোচনা করছেন, ভালো কথা; কিন্তু আপনারা ক্ষমতায় এলে কী করবেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে বিরোধী রাজনীতি কেবল প্রতিবাদের রাজনীতি হয়ে থাকবে; রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তিতে পরিণত হবে না।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়

আমাদের আরেকটি ভয়াবহ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলকে যেন মনে না হয় তারা পরস্পরের শত্রু।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। তীব্র বিতর্ক হবে। সংসদ উত্তপ্ত হবে। সরকারের নীতি নিয়ে বিরোধী দল কঠোর প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু দিন শেষে সবাই একই বাংলাদেশের মানুষ।

আজ যে বিরোধী দলে, কাল সে সরকারে যেতে পারে। আজ যে সরকারে, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি থেকে যায়।

তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—দল হারতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, নেতা বদলাতে পারে; কিন্তু দেশের ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি পূরণ করতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যায়।

জনগণ আর কাদা ছোড়াছুড়ি দেখতে চায় না

বাংলাদেশের মানুষ অনেক দেখেছে। তারা রাজনৈতিক সংঘাত দেখেছে, ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে, প্রতিশ্রুতির পাহাড় দেখেছে, আবার অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসও শুনেছে।

এখন তারা একটু শান্তি চায়।

একজন বাবা চান তার সন্তান ভালোভাবে পড়াশোনা করুক।

একজন মা চান ঘরে নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকুক।

একজন কৃষক চান সময়মতো সেচের পানি ও সাশ্রয়ী জ্বালানি।

একজন তরুণ চান একটি সম্মানজনক চাকরি।

একজন উদ্যোক্তা চান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি।

একজন সাধারণ নাগরিক চান নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

এই সাধারণ স্বপ্নগুলোই আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইশতেহার।

তাই এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের প্রশ্ন করার—

আমরা কি মানুষের স্বপ্নের রাজনীতি করছি, নাকি শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনীতি করছি?

“পেছনে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে, আবার বলছে বিদ্যুৎ চাই”—এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য হয়তো মুহূর্তের জন্য হাস্যরস সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু দেশের জ্বালানি সংকটের গভীর বাস্তবতা কোনো হাসির বিষয় নয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই সংকট নিয়ে দলীয় কটাক্ষ নয়, প্রয়োজন জাতীয় পরিকল্পনা।

সরকারের দায়িত্ব—সুশাসন ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।

বিরোধী দলের দায়িত্ব—সরকারের ভুল ধরার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত বিকল্প দেওয়া।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব—দুই পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা।

আর জনগণের দায়িত্ব—স্লোগানে নয়, কাজে বিচার করা।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে সরকার শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা করবে, আর বিরোধী দল শুধু সরকারের সমালোচনা করবে।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে—

সরকার বলবে: “এই আমাদের পরিকল্পনা।”

বিরোধী দল বলবে: “আমাদের পরিকল্পনা আরও ভালো।”

আর জনগণ বলবে—

“যে পরিকল্পনায় আমার ঘরে আলো জ্বলে, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়, আমার কৃষিক্ষেত্রে সেচ চলে, আমার কর্মসংস্থান হয়—আমরা সেই পরিকল্পনার পক্ষেই আছি।”

এটাই হোক নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি।

অপপ্রচার নয়—তথ্য ও যুক্তি।

বিভাজন নয়—গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা।

ক্ষমতার জন্য নয়—বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দল, কোনো নেতা, কোনো সরকার নয়—বাংলাদেশই সবার আগে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

ত্রিশূল-নিশানের বিতর্ক নয়, মতুয়া ঐক্যই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

পেছনে ফ্যানের বাতাস, অথচ মুখে ‘বিদ্যুৎ চাই’—এই রাজনীতি কি আর চলতে পারে?

অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি চাই।

আপডেট সময় : ১২:২২:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

 

রাজনীতি শুধু ক্ষমতার মসনদ দখলের লড়াই নয়। রাজনীতি মানুষের স্বপ্ন, মানুষের কান্না, মানুষের ক্ষুধা, মানুষের অন্ধকার ঘর আর আগামী দিনের আশার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক মহৎ দায়িত্ব। যে রাজনীতি মানুষের জীবনকে সহজ করে না, মানুষের দুর্ভোগের পাশে দাঁড়ায় না, সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল স্লোগানের রাজনীতি হয়ে যায়।

আজ বাংলাদেশের মানুষ সেই পুরোনো স্লোগানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা আর শুধু শুনতে চায় না—“সরকার ব্যর্থ”, “সব শেষ”, “কিছুই হচ্ছে না।” তারা জানতে চায়—তাহলে সমাধান কী?

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। তিনি বলেছেন—তিন মাস নয়, ছয় মাসের মধ্যে দেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধানের মতো কোনো কার্যকর পরিকল্পনা যদি বিরোধী দলের কাছে থাকে, তা সংসদে উপস্থাপন করা হোক। সরকারের পরিকল্পনার চেয়ে ভালো হলে সেই পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হবে।

এই বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছে।

আমরা কি শুধু অভিযোগ করতে চাই, নাকি দেশকে বাঁচানোর মতো বিকল্প পথও দেখাতে চাই?

বিদ্যুৎ নেই—অভিযোগ সত্য হলে সরকারকে জবাব দিতে হবে। জ্বালানি সংকট আছে—কেন আছে, তার ব্যাখ্যা সরকারকেই দিতে হবে। মানুষের ঘর অন্ধকার হলে সেই অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু একই সঙ্গে বিরোধী দলের কাছেও জনগণের প্রশ্ন আছে—আপনারা ক্ষমতায় গেলে কী করবেন?

শুধু বলবেন না, “সরকার পারেনি।”

বলুন—“আমরা পারব কীভাবে।”

শুধু বলবেন না, “বিদ্যুৎ সংকট।”

বলুন—“সংকট সমাধানের আমাদের পরিকল্পনা হলো এটি।”

শুধু বলবেন না, “জ্বালানির দাম বেশি।”

বলুন—“দাম কমাতে, সরবরাহ বাড়াতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে আমরা এই পদক্ষেপ নেব।”

এটাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে আসছে—কে বেশি জোরে অন্য পক্ষকে ব্যর্থ বলতে পারে। কিন্তু জনগণ এখন সেই প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত। তারা চায় না কে কাকে হারাল; তারা জানতে চায় দেশ কে জিতাবে।

একজন কৃষক যখন সেচের জন্য বিদ্যুৎ পান না, তার কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতার মূল্য কতটুকু?

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে ব্যবসা চালাতে পারেন না, তার কাছে দলীয় স্লোগানের অর্থ কী?

একজন মা যখন সন্তানের পড়ার সময় অন্ধকার ঘরে বসে থাকেন, তখন তিনি সরকারের ব্যর্থতা কিংবা বিরোধী দলের অভিযোগ—কোনোটিই শুনতে চান না। তিনি চান তার সন্তানের বইয়ের পাতায় আলো জ্বলুক।

সেই আলো জ্বালানোর রাজনীতিই আমাদের প্রয়োজন।

সমালোচনা হোক, কিন্তু সমাধানও আসুক

বিরোধী দলের কাজ সরকারের সমালোচনা করা—এটি গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সমালোচনা আর অপপ্রচার এক নয়।

তথ্যভিত্তিক সমালোচনা সরকারকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। যুক্তিনির্ভর বিরোধিতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সংসদে কঠিন প্রশ্ন করা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু মিথ্যা তথ্য, অর্ধসত্য, অতিরঞ্জন কিংবা জনগণের আবেগকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।

আবার সরকারের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। জনগণের প্রতিটি অভিযোগকে “অপপ্রচার” বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। জনগণের কষ্টকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে পাশ কাটানো যাবে না। বিদ্যুৎ নেই—তাহলে কেন নেই, জবাব দিতে হবে। জ্বালানি সংকট আছে—সমাধানের সময়সীমা জানাতে হবে। জনগণকে শুধু আশ্বাস নয়, পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিতে হবে।

কারণ গণতন্ত্রে জনগণই শেষ বিচারক।

বিরোধী দল কি বিকল্প সরকার হতে প্রস্তুত?

একটি শক্তিশালী বিরোধী দল শুধু সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে না; সে নিজেকে ভবিষ্যৎ সরকার হিসেবে প্রস্তুত করে।

অর্থনীতি কীভাবে চলবে—তার পরিকল্পনা থাকতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—তার রূপরেখা থাকতে হবে।

কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে—তার হিসাব থাকতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কী পরিবর্তন আসবে—তার নীতি থাকতে হবে।

দুর্নীতি কীভাবে কমবে—তার বাস্তব ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রশাসন কীভাবে জনবান্ধব হবে—তার কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।

অর্থাৎ জনগণ এখন জানতে চায়—“আপনারা সরকারের সমালোচনা করছেন, ভালো কথা; কিন্তু আপনারা ক্ষমতায় এলে কী করবেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে বিরোধী রাজনীতি কেবল প্রতিবাদের রাজনীতি হয়ে থাকবে; রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তিতে পরিণত হবে না।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়

আমাদের আরেকটি ভয়াবহ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলকে যেন মনে না হয় তারা পরস্পরের শত্রু।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। তীব্র বিতর্ক হবে। সংসদ উত্তপ্ত হবে। সরকারের নীতি নিয়ে বিরোধী দল কঠোর প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু দিন শেষে সবাই একই বাংলাদেশের মানুষ।

আজ যে বিরোধী দলে, কাল সে সরকারে যেতে পারে। আজ যে সরকারে, আগামীকাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি থেকে যায়।

তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—দল হারতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, নেতা বদলাতে পারে; কিন্তু দেশের ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি পূরণ করতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যায়।

জনগণ আর কাদা ছোড়াছুড়ি দেখতে চায় না

বাংলাদেশের মানুষ অনেক দেখেছে। তারা রাজনৈতিক সংঘাত দেখেছে, ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে, প্রতিশ্রুতির পাহাড় দেখেছে, আবার অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসও শুনেছে।

এখন তারা একটু শান্তি চায়।

একজন বাবা চান তার সন্তান ভালোভাবে পড়াশোনা করুক।

একজন মা চান ঘরে নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকুক।

একজন কৃষক চান সময়মতো সেচের পানি ও সাশ্রয়ী জ্বালানি।

একজন তরুণ চান একটি সম্মানজনক চাকরি।

একজন উদ্যোক্তা চান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও স্থিতিশীল অর্থনীতি।

একজন সাধারণ নাগরিক চান নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।

এই সাধারণ স্বপ্নগুলোই আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইশতেহার।

তাই এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের প্রশ্ন করার—

আমরা কি মানুষের স্বপ্নের রাজনীতি করছি, নাকি শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনীতি করছি?

“পেছনে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে, আবার বলছে বিদ্যুৎ চাই”—এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য হয়তো মুহূর্তের জন্য হাস্যরস সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু দেশের জ্বালানি সংকটের গভীর বাস্তবতা কোনো হাসির বিষয় নয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই সংকট নিয়ে দলীয় কটাক্ষ নয়, প্রয়োজন জাতীয় পরিকল্পনা।

সরকারের দায়িত্ব—সুশাসন ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।

বিরোধী দলের দায়িত্ব—সরকারের ভুল ধরার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত বিকল্প দেওয়া।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব—দুই পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা।

আর জনগণের দায়িত্ব—স্লোগানে নয়, কাজে বিচার করা।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে সরকার শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা করবে, আর বিরোধী দল শুধু সরকারের সমালোচনা করবে।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে—

সরকার বলবে: “এই আমাদের পরিকল্পনা।”

বিরোধী দল বলবে: “আমাদের পরিকল্পনা আরও ভালো।”

আর জনগণ বলবে—

“যে পরিকল্পনায় আমার ঘরে আলো জ্বলে, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়, আমার কৃষিক্ষেত্রে সেচ চলে, আমার কর্মসংস্থান হয়—আমরা সেই পরিকল্পনার পক্ষেই আছি।”

এটাই হোক নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

অভিযোগের রাজনীতি নয়—সমাধানের রাজনীতি।

অপপ্রচার নয়—তথ্য ও যুক্তি।

বিভাজন নয়—গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা।

ক্ষমতার জন্য নয়—বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দল, কোনো নেতা, কোনো সরকার নয়—বাংলাদেশই সবার আগে।

এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু – সম্পাদক

সারাক্ষণ বার্তা।