রাজনীতি মানেই কেবল ক্ষমতা, সংসদ, দলীয় কর্মকাণ্ড কিংবা নির্বাচনী সমীকরণ নয়। একজন জননেতার চিন্তা, অভিজ্ঞতা, রুচি, জীবনবোধ এবং সমাজ ও দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক। রাজনীতির প্রচলিত বলয়ের বাইরে গিয়ে যখন কোনো জনপ্রতিনিধি প্রকৃতি, ভ্রমণ, সংস্কৃতি ও দেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর সেই অংশগ্রহণ নিছক একটি বিনোদনমূলক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার একটি ভিন্নমাত্রিক প্রকাশ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি এমনই একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান। আর জে হাসিবের আমন্ত্রণে তিনি অংশগ্রহণ করেন ঢাকা এফএম ৯০.৪-এর ভিন্নধর্মী ভ্রমণবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘Let’s Go With RJ Hasib’-এ। অনুষ্ঠানে তিনি দেশ-বিদেশের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা এবং এ খাতের বিকাশ নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন।
হেলেন জেরিন খানের এই অংশগ্রহণের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম কোনো রেডিও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এমন একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভান্ডারে একটি নতুন সংযোজন।
সাধারণত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গণমাধ্যমে উপস্থিতি বলতে রাজনৈতিক বক্তব্য, সমসাময়িক পরিস্থিতি, দলীয় অবস্থান কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু ভ্রমণবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে একজন জনপ্রতিনিধি যখন দেশের সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, পর্যটনসম্পদ ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর পরিচিতির পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। রাজনীতির বাইরে তাঁর জীবনবোধ ও দেশকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, হাওর, বনাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বৈচিত্র্যময় লোকজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এই দেশ। অথচ পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রচার, নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানসম্মত সেবার অভাবে দেশের পর্যটনশিল্প এখনো তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। পর্যটনকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সংসদীয় অভিজ্ঞতা, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ এবং সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরতে তাঁদের উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
হেলেন জেরিন খানের এই রেডিও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি একজন জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি ভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। রেডিও এখনো মানুষের কাছে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় একটি গণমাধ্যম। এর মাধ্যমে শ্রোতারা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, বরং একজন ভ্রমণপ্রেমী, অভিজ্ঞ মানুষ এবং দেশ সম্পর্কে চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবেও জানার সুযোগ পান।
তবে এ ধরনের অংশগ্রহণের প্রকৃত সার্থকতা কেবল অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনায় উঠে আসা পর্যটন ভাবনাগুলো যদি বাস্তব উদ্যোগ, নীতিগত প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে কার্যকর রূপ পায়, তাহলেই এমন আয়োজনের সামাজিক মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
আর জে হাসিব ও ঢাকা এফএম ৯০.৪ কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানাতে হয়। কারণ, গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সংবাদ পরিবেশন কিংবা বিনোদন দেওয়া নয়; মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, ঐতিহ্যচেতনা এবং ইতিবাচক চিন্তার বিকাশ ঘটানোও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পরিশেষে বলা যায়, হেলেন জেরিন খানের ‘Let’s Go With RJ Hasib’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি নতুন অভিজ্ঞতা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজেকে উপস্থাপনের একটি সুন্দর প্রয়াস। রাজনীতির পাশাপাশি দেশ, প্রকৃতি, পর্যটন ও সংস্কৃতি নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের এমন ইতিবাচক অংশগ্রহণ আরও বাড়ুক। কারণ, একজন মানুষের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব কেবল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে নয়, বরং দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর চিন্তা, অনুভব এবং দায়িত্ববোধ দিয়েও মূল্যায়িত হয়।
রাজনীতির ব্যস্ততার মধ্যেও প্রকৃতি ও দেশের সৌন্দর্যকে অনুভব করার এই প্রয়াস হোক আরও বিস্তৃত, আরও প্রাণবন্ত এবং আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরার অনুপ্রেরণা।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী। 





















