মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের দিঘীরপাড়ে অবস্থিত শ্রী শ্রী মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রমকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, নানা চড়াই-উতরাই ও অচলাবস্থার পর অবশেষে(১৫ অক্টোবর ,২০২৬) নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। সম্মিলিত মতামত ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে গঠিত এই কমিটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন নয়; বরং সামাজিক সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি ও ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
নতুন কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রণব বিশ্বাস সভাপতি, বিএনপির ভবেন সরকার সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপির বাবলু সরকার কোষাধ্যক্ষ ও বিশ্ব সরকার সহকারী কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একই ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে তাঁদের সম্মিলিত দায়িত্ব গ্রহণ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক আস্থা ও স্বচ্ছতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় তার ওপর।
বিভেদের অতীত পেরিয়ে ঐক্যের পথে
একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষের বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের আশ্রয়স্থল। এমন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা থাকলে তার প্রভাব শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক পরিবেশ এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।
মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রমের নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কে কোন রাজনৈতিক দল করেন, তা নয়; বরং কে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কতটা আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও একটি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য স্বাভাবিক, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন সামাজিক সম্পর্ক নষ্টের কারণ না হয়। বরং ভিন্নমতের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতাই সহনশীল সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
নতুন কমিটির সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—অতীতের যে বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়ে থাকুক না কেন, সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে তথ্য, যুক্তি, আলোচনা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কাউকে অযথা দোষারোপ করা নয়, আবার কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা করাও নয়; প্রয়োজন নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজনীতির নয়, জনকল্যাণের কেন্দ্র হোক
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িত। এ কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলে তার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বঞ্চিত করা বা কোনো পক্ষকে অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়াও সম্প্রীতির পরিপন্থী।
নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ভবেন সরকারের বক্তব্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন, এলাকার মানুষের সহযোগিতা গ্রহণ এবং সেবাশ্রমের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রেখে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে পরিচালনার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
তবে রাজনীতিমুক্ত রাখার অঙ্গীকার শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কমিটির প্রতিটি সিদ্ধান্তে সকলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, বৈষম্যহীন আচরণ, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য যেন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার না করে। সেবাশ্রম পরিচালিত হতে হবে প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধান, ধর্মীয় ঐতিহ্য, জনস্বার্থ ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই আস্থার ভিত্তি
যেকোনো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তদের দান, অনুদান, পূজা-পার্বণের আয়-ব্যয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
নবনির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ বাবলু সরকার আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে—
প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের নিয়মিত ও লিখিত হিসাব সংরক্ষণ।
দান ও অনুদানের রসিদ প্রদান এবং যথাযথ নথিপত্র রাখা।
নির্দিষ্ট সময় অন্তর কমিটির সভায় আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন।
প্রয়োজন অনুযায়ী নিরপেক্ষ নিরীক্ষা বা হিসাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা।
প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দলিলপত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথির সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আর্থিক স্বচ্ছতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অবিশ্বাসের প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সবার আস্থা সুদৃঢ় করার কার্যকর পদ্ধতি। অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং অভিযোগ না থাকলেও নিয়মিত হিসাব প্রকাশ—দুই ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
নতুন কমিটির কাছে মানুষের প্রত্যাশা
দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি কমিটি গঠিত হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু কমিটি গঠনই চূড়ান্ত সাফল্য নয়; বরং সাফল্যের সূচনা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নতুন নেতৃত্বকে কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য প্রমাণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব: সেবাশ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভক্ত, সেবায়েত, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করলে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচালনা: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে অবহেলিত না হন। প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করার সদিচ্ছা ও যোগ্যতাই হোক মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।
তৃতীয়ত, বিরোধ নিষ্পত্তিতে ন্যায়সংগত পদ্ধতি: অতীতের কোনো অভিযোগ, বিরোধ কিংবা অনিয়মের প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধানের আলোকে নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার; পক্ষপাত নয়, নিরপেক্ষতা—এই নীতিই হোক পরিচালনার ভিত্তি।
চতুর্থত, ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ: সেবাশ্রমের ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি মানবসেবা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের কাছে আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
সম্প্রীতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে নেতৃত্বকে
সামাজিক সম্প্রীতি কেবল বক্তৃতা কিংবা আনুষ্ঠানিক ঐক্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন ন্যায়সংগত আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা। নতুন কমিটিতে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের অন্তর্ভুক্তি একটি আশাব্যঞ্জক দিক। কিন্তু এই অন্তর্ভুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারিত হবে বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
কমিটির সভাপতি প্রণব বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক ভবেন সরকার, কোষাধ্যক্ষ বাবলু সরকার, সহকারী কোষাধ্যক্ষ বিশ্ব সরকার এবং অন্য সদস্যদের মনে রাখতে হবে—তাঁদের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের মর্যাদা বৃদ্ধি করা নয়; বরং সেবাশ্রমের ঐতিহ্য, পবিত্রতা, সম্পদ ও জনআস্থা রক্ষা করা। তাঁদের পারস্পরিক সহযোগিতা যদি ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে নিবেদিত হয়, তাহলে এই কমিটি স্থানীয় পর্যায়ে সহাবস্থানের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
একই সঙ্গে এলাকার সাধারণ মানুষকেও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। গুজব, বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দেওয়ার পরিবর্তে সত্যনিষ্ঠ তথ্য, যুক্তিসংগত সমালোচনা এবং সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। কমিটির জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেমন জনগণের অধিকার, তেমনি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দায়িত্বশীল সহযোগিতা করাও সামাজিক কর্তব্য।
উপসংহার: কমিটি গঠন নয়, আস্থা পুনর্গঠনই হোক মূল লক্ষ্য
শ্রী শ্রী মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রমের নতুন কমিটি গঠনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন, সামাজিক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানের গৌরব ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা। এই প্রত্যাশা পূরণে নতুন নেতৃত্বের সামনে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সেবাশ্রম কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি ধর্মীয় ঐতিহ্য, সম্মিলিত বিশ্বাস ও সামাজিক উত্তরাধিকারের অংশ। তাই এর পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
রাজনীতির পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দলীয় আধিপত্য থাকা উচিত নয়। মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন সম্প্রীতির প্রতিবন্ধক না হয়। নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও জনআস্থার প্রশ্নে কোনো আপস করা চলে না।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর গঠিত এই নতুন কমিটি যদি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কাজে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রমে শুধু প্রশাসনিক স্থবিরতাই কাটবে না, ফিরে আসতে পারে মানুষের আস্থা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্মিলিত অগ্রযাত্রার পরিবেশ। শেষ পর্যন্ত এই কমিটির সাফল্য নির্ধারিত হবে একটি প্রশ্নের উত্তরে—তারা কতটা আন্তরিকভাবে প্রমাণ করতে পারে যে ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠান, বিভেদের ঊর্ধ্বে সম্প্রীতি এবং ক্ষমতার ঊর্ধ্বে সেবাই তাদের মূল অঙ্গীকার।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী 























