একজন শিক্ষক যখন অবসর নেন, তখন শেষ হয় একটি চাকরি। কিন্তু একজন প্রিয় শিক্ষক যখন বিদায় নেন, তখন শেষ হয় না কোনো সম্পর্ক। বরং তখনই বোঝা যায়—একজন মানুষ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে কতটা ভালোবাসা অর্জন করেছেন।
শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের প্রাঙ্গণে সেদিন যেন অন্যরকম এক আবহ। আনন্দ ছিল, ছিল সম্মান ও আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে ছিল এক অদৃশ্য বিষণ্নতা। কারণ দীর্ঘ ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে বিদায় নিচ্ছিলেন বিদ্যালয় শাখার জীববিদ্যা বিষয়ের শিক্ষক প্রীতি লতা ঢালী।
১৯৯৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে জীববিদ্যার পাঠ নিয়েছে। সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আত্মিক সম্পর্ক। আর ধীরে ধীরে এই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে তাঁর কর্মস্থলের চেয়েও বেশি কিছু—তাঁর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই তাঁর আনুষ্ঠানিক বিদায়।
বিদায়ের আয়োজনেও ছিল ভালোবাসার ছোঁয়া
প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বিশেষ বিদায় অনুষ্ঠান।
তাঁকে উষ্ণ আতিথেয়তায় সম্মান জানানো হয়। নানা উপহার দিয়ে বিদায়ী শিক্ষককে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত করা হয়। দুপুরে ছিল লাঞ্চের আয়োজন।
অনুষ্ঠানকে সফল ও সার্থক করে তুলতে আন্তরিকভাবে কাজ করেন সহকারী অধ্যাপক খায়রুণ নেছা আফরোজা, আইসিটি শিক্ষক বিপাশা হালিম, গোপাল চন্দ্র বালাসহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ।
আয়োজনের প্রতিটি পরতে যেন একটি বার্তাই ছিল—
“আপনি আমাদের কাছে শুধু একজন সহকর্মী নন; আপনি আমাদের পরিবারের একজন।”
বক্তব্যে উঠে এলো ৩৩ বছরের স্মৃতি
বিদায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাসিবুল হাসান হাওলাদার।
বক্তব্য রাখেন সহকারী অধ্যাপক হারাধন বালা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন বিষয়ের শিক্ষক গৌরাঙ্গ বসু, বিদায়ী শিক্ষক প্রীতি লতা ঢালী, নিখিল রঞ্জন দত্ত, শিক্ষার্থী তোড়া মন্ডল প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী অধ্যাপক নকুল চন্দ্র বৈরাগী ও সহকারী অধ্যাপক ফাইজুর রহমান মামুন।
বক্তব্যে ফিরে আসে দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা স্মৃতি। উঠে আসে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের নিষ্ঠা, সহকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধের কথা।
কথা বলতে বলতে কখনো কণ্ঠ ভারী হয়েছে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কখনো থেমে গেছে বাক্য।
কারণ কিছু স্মৃতি মুখে বলা যায় না।
কিছু স্মৃতি শুধু চোখ দিয়ে প্রকাশ পায়।
তারপর এলো বিদায়ের সেই মুহূর্ত
অনুষ্ঠান শেষ হলো।
উপহার দেওয়া হলো। শুভেচ্ছা জানানো হলো। আনুষ্ঠানিকতার পর্ব শেষ হলো।
এবার প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামকে গাড়িতে করে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পালা।
সেই মুহূর্তটিই যেন হয়ে উঠল দিনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়।
ম্যাডাম গাড়িতে উঠলেন।
চারপাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
কেউ চোখের পানি লুকাচ্ছেন। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ আবার আর কান্না ধরে রাখতে পারছেন না।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
যে শিক্ষককে এতদিন প্রতিদিন দেখেছে, তাঁর কণ্ঠ শুনেছে, তাঁর কাছ থেকে শিখেছে—আজ সেই মানুষটিকে বিদায় জানানো যে কতটা কঠিন, তা সেদিনের অশ্রুই বলে দিয়েছে।
গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
আর তখনই যেন ভেঙে পড়ল আবেগের শেষ বাঁধ।
কেউ হাত নাড়লেন।
কেউ চোখ মুছলেন।
কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলেন।
আর কেউ হয়তো মনে মনে বললেন—“ম্যাডাম, আরেকটু থাকুন…”
কিন্তু সময় কাউকে ধরে রাখে না।
গাড়ি চলে গেল।
প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামকে নিয়ে গাড়িটি যখন প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ ছেড়ে গেল, তখনও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
চোখে পানি।
মনে শূন্যতা।
আর চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা।
একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো।
এ কান্না আসলে ভালোবাসার কান্না
একজন মানুষের বিদায়ে এতগুলো মানুষের চোখে পানি কেন আসে?
কারণ তিনি হয়তো শুধু দায়িত্ব পালন করেননি—সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন।
শিক্ষকতা পেশার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। একজন শিক্ষক বেতন পান তাঁর শ্রমের বিনিময়ে; কিন্তু ভালোবাসা পান তাঁর মানবিকতার বিনিময়ে।
প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামের বিদায়ের দিনের অশ্রু তাই কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়।
এ অশ্রু তাঁর অর্জন।
৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন, বিদায়ের দিনে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার
একজন শিক্ষক জীবনে অনেক পুরস্কার পেতে পারেন। সনদ পেতে পারেন, সম্মাননা পেতে পারেন, পদমর্যাদা পেতে পারেন।
কিন্তু অবসরের দিনে প্রিয় শিক্ষার্থীর চোখের পানি—এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
যে শিক্ষকের চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থী কাঁদে, সহকর্মীর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিষণ্ন হয়ে ওঠে—তিনি নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত জীবনে কিছু মূল্যবান অর্জন করে গেছেন।
তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
শিক্ষক অবসর নেন, তাঁর শিক্ষা নয়
চাকরির বিধি অনুযায়ী আজ প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামের শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে।
কিন্তু তাঁর শেখানো শিক্ষা কি শেষ হয়ে গেছে?
না।
তিনি আর হয়তো নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াবেন না। আর হয়তো খাতা নিয়ে বসবেন না। আর হয়তো প্রতিদিন সহকর্মীদের সঙ্গে কর্মব্যস্ততায় অংশ নেবেন না।
কিন্তু তাঁর শেখানো কোনো একটি কথা হয়তো কোনো শিক্ষার্থী সারাজীবন মনে রাখবে।
কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী হয়তো জীবনের কঠিন মুহূর্তে তাঁর কথা স্মরণ করবে।
কেউ হয়তো বহু বছর পরও বলবে—
“আমাদের প্রীতি লতা ম্যাডাম এমন করে পড়াতেন…”
এটাই শিক্ষকের অমরত্ব।
একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু তার ফলাফল কিংবা অর্জনের ইতিহাস নয়। সেই ইতিহাস তৈরি হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক দিয়ে।
১৯৯৪ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ে প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডাম নিজেই হয়ে উঠেছেন এই প্রতিষ্ঠানের জীবন্ত ইতিহাসের একটি অংশ।
তাঁর সামনে দিয়ে বহু ব্যাচের শিক্ষার্থী এসেছে-গেছে। তাঁদের কেউ আজ প্রতিষ্ঠিত, কেউ হয়তো দূরদেশে। কিন্তু তাঁদের স্মৃতিতে এই শিক্ষকের একটি জায়গা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
আজকের বিদায় সেই সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করল।
সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই হয়
আজকের দৃশ্য আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল—
সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় বিচ্ছেদের মুহূর্তে।
যে মানুষ চলে যাওয়ার সময় এতগুলো চোখ ভিজিয়ে দিতে পারেন, তিনি জীবনে নিশ্চয়ই কিছু দিয়ে গেছেন।
তিনি দিয়েছেন জ্ঞান।
দিয়েছেন শাসন।
দিয়েছেন স্নেহ।
দিয়েছেন অনুপ্রেরণা।
আর সবচেয়ে বড় কথা—দিয়েছেন নিজের জীবনের ৩৩টি মূল্যবান বছর।
বিনিময়ে আজ তিনি পেলেন অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা।
সত্যিকারের ভালোবাসা বোধহয় এমনই হয়।
শেষ দৃশ্যটি থেকে যাবে স্মৃতিতে
আগামীকাল আবার স্কুলের ঘণ্টা বাজবে।
শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যাবে। শিক্ষকরা পাঠদান করবেন। প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।
কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা থাকবে।
হয়তো কোনো এক সময় জীববিদ্যার শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে কারও মনে পড়বে—
“এখানেই তো প্রীতি লতা ম্যাডাম দাঁড়িয়ে পড়াতেন।”
হয়তো কোনো শিক্ষার্থী পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে করে নিঃশব্দে হাসবে।
হয়তো তারপর চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও জমবে।
কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায়।
বিদায় প্রিয় ম্যাডাম
প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডাম,
আজ আপনি আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টেনেছেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেনি।
আপনি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছেন,
কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি থেকে নয়।
আপনি শ্রেণিকক্ষ ছেড়েছেন,
কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয় ছাড়েননি।
আপনি কর্মজীবন শেষ করেছেন,
কিন্তু আপনার শিক্ষকতার গল্প শেষ হয়নি।
আজ যে অশ্রু ঝরেছে, সেটিই আপনার ৩৩ বছরের সাধনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্মাননা।
বিদায় প্রিয় শিক্ষক।
আপনার পথ হোক শান্তিময়, জীবন হোক আনন্দময়। আপনার অবসরজীবন হোক সুস্থ, সুন্দর ও প্রশান্তিতে ভরা।
আর শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের স্মৃতির পাতায় আপনি থাকুন—
চিরদিন।
কারণ—
“কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান,
কিন্তু প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের স্মৃতি কখনো চলে যায় না।
আর কিছু শিক্ষক অবসর নেন,
কিন্তু তাঁদের ছাত্রদের হৃদয়ে কোনোদিন অবসর নেন না।”
প্রীতি লতা ঢালী ম্যাডামের বিদায়ও তেমনই এক বিদায়—যেখানে বিচ্ছেদের চেয়ে ভালোবাসা বড়, আর অশ্রুর চেয়ে স্মৃতি আরও দীর্ঘস্থায়ী।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
এডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু - শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষকও মানবাধিকার কর্মী 





















