ভয় বা ভীতি কাকে বলে? ভয় কিভাবে তৈরী হয়, কত প্রকার তার শ্রেনী বিন্যাস করা বেশ কঠিন। তবে লোক ভয়,আত্মভয়, আকস্মিক ভয় বলে কিছু অনুভুতি আমাদের মধ্যে কাজ করে। ভয় মানুষকে মানসিক ভাবে দূর্বল করে দেয়।আবার ভয় মানুষকে সংযত করার সাহস যোগায়,কোন কোন ভয় হঠাৎ নিজেকে থমকে দেয়।
আমি যে ভয়ের কথা বলতে চাচ্ছি তা মানসিক ভয় বা আকস্মিক ভয়। মানসিক ভয়ই আকস্মিক ভয়ের জন্ম দেয়। মানসিক ভয় লোকে তৈরী করে দেয়। যাকে ভয় দেয় মূলতঃ তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। যেমন মা তার শিশুকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আগাম ভয় দেয়।
এখন থেকে বহু বছর পূর্বে স্কুলের প্রথম পাঠ নেওয়া সন্তানটিকে মা বলে দিতেন পথে যেন একা না চলে। সে সময় রাস্তা তেমন ছিল না। হালটে এক পেয়ে পথই ছিল পথিকের পথ চলার মাধ্যম। দিন ভর এই এক পায়ে পথে লোক চললেও সন্ধ্যার পরে লোক চলাচল ছিল না। আবার দিনেও এ সকল পথে লোকচলাচল ছিল খুব পাতলা। হালটের ব্যানা ঝারে ঝারে বনের মত হয়ে থাকত। এর ভিতরে শিয়াল, কেদো বাঘ লুকিয়ে থাকত। সুযোগ পেলে ছাগল,বাছুর ধরে গভীর জংগলে নিয়ে যেত। বেশীর ভাগ হালটের পাশ দিয়েই জংগল থাকায় শিশুদেরও বিভিন্ন ভয়ের কথা মা বাবা জানিয়ে দিয়ে বলতেন দল বদ্ধ হয়ে চলা ফেরা করতে। যেমন চালিমিয়া প্রাইমারি স্কুলের পূর্ব পাড়া থেকে যারা যেত তাদের এয়াকুব মোল্লার বটতলা দিয়ে যেতে হতো। লোকশ্রুতি এবং মায়ের কিছু পরামর্শ থাকতো এই বটতলা অতিক্রম করার।যেমন গাছের ডালের দিকে যেন না তাকানো হয়। একত্রিত হয়ে যেন আল্লাহ,রাসুলের নাম নিয়ে এই এলাকা পার হয়। কারণ অনেক সময় গাছের ডালে প্রেতাত্মা শিশু ছদ্মবেশে দূরের ডালে লম্বা পা রেখে বসে থাকে। শিশুরা যখন তাকায় তখন ভয় দেয়। সন্ধ্যায় মানুষ এই বট তলা দিয়ে পথ চললে বড় ষাড়ের আকার ধরে রাস্তায় শুয়ে থাকতো ভূত।আবার বড় শুয়োরের আকার ধরে ঘোৎ ঘোৎ করে সামনে দিয়ে চলে যেত। লাল পাড়ে সাদা শাড়ি পরে হেটে যেত কোন নারী। এ সব প্রানী ও নারী প্রেতাত্মা কি-না চেনার উপায় শিখিয়ে দিতেন বাড়ির অভিভাবক। পরামর্শ ছিল ” এ রকম দেখলে বসে পড়তে হবে। বসে পায়ের দিকে খেয়াল করলে প্রেতাত্মা হলে এদের পা মাটি থেকে শুন্যে দেখা যাবে।” বটগাছে অনেক সময় বিনা কারনে শিশুদের দল বেধে আনন্দ ক্রীড়ার শব্দ শোনা যেত।কাছে গেলে কিছুই দেখা যেত না।
বাবুখালী থেকে কোমরপুর যাওয়ার পথে একটি বট গাছ আছে।যাকে কালি বটতলা বলা হয়। এখানে একটি কালি মন্দির আছে। এখানেই আমাবস্যার রাতে দেখা যেত সাদা শাড়ি পরে চুল ছেড়ে দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে নারী । কেউ জিজ্ঞাসা করলে কথা না বলে হাটতে থাকতো। চোখের পলক এদিক ও দিক হলেই আর দেখা যেত না।
এ ইউনিয়নে দুটি জায়গায় ভুতের নৃত্য দেখা যেত।ঠাকুরের হাটের বট গাছে এবং গোয়াল পাড়ার মাঠের বাবলা গাছে। এ সকল নৃত্য হতো কোন আমাবস্যার রাতে। রাত গভীর হলে জন মানবের কোলাহল থেমে গেলে এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আলোর গোলা ঝাঁকে ঝাকে ঠাকুরের হাট বট গাছে এবং গোয়াল পাড়ার বাবলা গাছে এসে পড়ত। ঐ আগুনের গোলাই ছিল প্রেতাত্মা। জড়ো হওয়ার পরে শুরু হতো আলোর নাচন। কখনো মানুষের সাড়া পেলে সব বন্ধ হয়ে যেত।
একটি মাঠে গোদান দেখা যেত। রায়পুর থেকে গোয়াল পাড়া মাঠের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা চালমিয়া বিশ্বাস পাড়া উঠেছে এই রাস্তায়। গোদান হ’ল গরুর প্রেতাত্মা। যে সমস্ত গরু গলায় ফাস লেগে মারা যেত সেই গরু প্রেতাত্মা। কবে এই মাঠে গাছে লতা পাতায় পেচিয়ে গরু শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল।সেই গরুর প্রেতাত্মা দেখা যেত পাহাড়ের মত মাঠের মধ্যে দাড়িয়ে থাকতে।
অনেক বড় বড় গাছে মৌচাক পড়লে মৌয়ালরা রাতে মধু সংগ্রহ করতে যেত। অনেক চাকের উপর মা কালীর লম্বা জিহবা দেখতে পেত। এটা দেখলে তারা মধু সংগ্রহ না করে ফিরে যেত।
চারটি শ্মশান আছে বাবুখালী ইউনিয়নে। প্রত্যেক শ্মশানেই ভয়ের শ্রুতি আছে। তবে সাধু যারা শ্মশানে রাতেও থাকে তারা কোনদিন দেখেনি বলেই মন্তব্য করেন। তবে তারা তাদের বাহাদুর প্রমাণ করতে বলতেন,”তারা হলো শিবের চ্যালা চামুন্ডা। তাদের কাছে প্রেতাত্মা আসে না।”
বাশো বট গাছটির বয়স আনুমানিক শতবর্ষ উর্ধ। এখানে একটি কালি মন্দির আছে। এখানেও ভয় ছিল বলে জনশ্রুতি আছে। নিয়মিত এ মন্দিরে এখনও পূজা হয়। আমাবস্যা পূর্নিমার রাতে সাদা পোশাকে লোক শুয়ে থাকত মন্দিরের সামনে। কখনও কখনও মন্দিরের সামনে রাতের বেলা সাদা শাড়ি পরিহিত নারী দাড়িয়ে থাকত। আবার হঠাৎ হারিয়ে যেত। অনেক সময় তাকে অনুসরণ করার আহবান জানাত। সাথে গেলে মাঠের মধ্যে নিয়েই তার স্বরুপ উন্মোচন করতো, তারপর মেরে ফেলত।।
এ ধরনের গল্প কথা সারা দেশের কোনো না কোনো জায়গায় পাওয়া যায়। সবই মিথ কিন্তু গল্পগুলো সত্যের মত মনে হয়। হাজরা তলায় শিব আসে।শিব সন্যাসিরা চৈত্র পূজার রাতে অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করে যেমন কাঁচা মাছ খায়,মৃত দেহ খুজে বের করে তার উপর নৃত্য করে ইত্যাদি। এ রাতে এদের সামনে পড়লে নির্ঘাত মৃত্যু। তাই এ রাতে রাস্তায় লোক চলাচলও কম থাকত।
এ ছাড়াও ছিল বাবুখালী নীল কুঠির গলা কাটা সাহেবের ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানো। মস্তকহীন একজন মানুষকে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর দৃশ্যে কার না ভয় লাগে?
যে দিন থেকে টর্চ মানুষের হাতে এসেছে তার পর ভয়ের গল্প শুধু প্রচলিতই থেকেছে। ভয় উঠে গিয়েছে, প্রেতের ভয়ের চেয়ে মানব ভয় বাসা বেঁধেছে।
সৈয়দ রবিউল ইসলাম - সাবেক অধ্যক্ষ 























