যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। কানাডার কিছু দুগ্ধপণ্য, অধিকাংশ মদ্যপ পানীয় এবং মোটরসাইকেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস এ ঘোষণা দেয়। একই দিন কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। গত মাসে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের জবাবেই এ পদক্ষেপ নেয় অটোয়া।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার পণ্যকে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয়চুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছেন। তিনি মার্কিন পণ্যের জন্য কানাডাকে ‘পূর্ণ ও ন্যায্য সমতা’ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এসব চুক্তিতে কানাডীয় পণ্যকে অযোগ্য ঘোষণা করতে জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতি আরও স্বাধীন ও বহুমুখী করাই এখন কানাডার লক্ষ্য। তিনি বলেন, কোনো দেশ যাতে কানাডাকে জিম্মি করতে না পারে এবং কানাডা নিজেদের মতো করে চলতে পারে, সেটিই তাদের কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
গত ২২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, কানাডা মার্কিন দুগ্ধ, মদ্যপ পানীয় ও গাড়ি শিল্পের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে কানাডার সুরক্ষিত দুগ্ধবাজার এবং দেশটির কাঠ উৎপাদনকারীদের দেওয়া ভর্তুকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ছিল। তবে এসব বিরোধ সত্ত্বেও দেশ দুটি দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেই সম্পর্কে দ্রুত অবনতি হয়েছে। কানাডীয় পণ্যে শুল্ক আরোপের পাশাপাশি তিনি একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। এসব বক্তব্য কানাডায় ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় কানাডার বিভিন্ন ধরনের মদ ও মদ্যপ পানীয়, কিছু মোটরসাইকেল ও মোপেড, দুগ্ধজাত পণ্য—এর মধ্যে ঘোলের গুঁড়াসহ বিভিন্ন পণ্য এবং কয়েক ধরনের মোলাসেস রয়েছে।
অন্যদিকে মঙ্গলবার কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, পনির, গৃহস্থালি সামগ্রী, পোশাক, প্রসাধনী ও কৃষি সরঞ্জাম রয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেছেন, মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য সংঘাত বাড়ানো নয়; বরং কানাডীয় শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন বাজার খুঁজে বের করার উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
বর্তমানে কানাডার মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। তাই মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে অটোয়া। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করার বিভিন্ন সম্ভাবনাও আলোচনা হচ্ছে।
কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের কারণে স্বল্পমেয়াদে কানাডাকে কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য বহুমুখীকরণে গতি আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা কবে আবার শুরু হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুই দেশের কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখলেও কেউই দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরতে চাইছে না। ফলে বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ দুই মিত্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ আরও কতটা দীর্ঘায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ ডেস্ক 

























