ঢাকা ০৭:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব: সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধা এক রাত, আনন্দের অমলিন স্মৃতি। খুলনায় জাতীয় পার্টির উদ্যোগে উপজেলা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা খিলগাঁওয়ে বাসা ভাড়ার নামে ডেকে এনে শিক্ষক ও বিজ্ঞানী সরোয়ারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা, থানায় মামলা খুলনায় গৃহবধূ খুশিকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা দেশীয় অস্ত্র তৈরি করে বিক্রির বিজ্ঞাপন, এসআরবির অভিযানে যুবক আটক শাহপরীতে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৫০ হাজার ইয়াবা জব্দ ঢাকা জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬, সহযোগিতার জন্য পুলিশ সুপারের কৃতজ্ঞতা গফরগাঁওয়ে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: স্বামী ও শাশুড়ির দিকে সন্দেহের তীর গোপালগঞ্জে রঘুনাথপুর সড়কের সংস্কারকাজ বন্ধ, ধুলায় দুর্ভোগে পথচারীরা প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর উপলক্ষে প্রস্তুতি, জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনে কেসিসি প্রশাসক
ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মিলনমেলা, সংস্কৃতির উচ্ছ্বাসে মুখরিত গ্রামবাংলা—মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব যেন সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব: সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধা এক রাত, আনন্দের অমলিন স্মৃতি।

  • সারাক্ষণ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৫:২৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ৭৩ জন সংবাদটি পড়েছেন

 

উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়? দেবীর আরাধনায়, আলোকসজ্জার ঝলমলে আয়োজনে, নাকি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অনাবিল আনন্দে? হয়তো সবকিছুর মধ্যেই উৎসবের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তবে উৎসব যখন ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়কে মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, তখনই তা হয়ে ওঠে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধা বাড়ি সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সেই মানবিক মিলনেরই এক আনন্দঘন দৃষ্টান্ত।

গত ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার রাত ১০টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনের আনন্দমুখর পরিবেশ গড়িয়ে যায় পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত। দীর্ঘ রাতের প্রতিটি প্রহর যেন আবদ্ধ ছিল গান, নৃত্য, অভিনয়, হাসি, উচ্ছ্বাস আর মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায়। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মৃধা বাড়ি পরিণত হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।

এটি কেবল একটি পূজামণ্ডপের অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচিত হওয়ার, আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক আন্তরিক প্রয়াস।

আয়োজনের বর্ণাঢ্যতা, মানুষের ভালোবাসা

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গৌরাঙ্গ বসুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা কার এক্সপ্রেসের স্বত্বাধিকারী প্রাণতোষ মজুমদার, রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম, ওসি তদন্ত কুতুব উদ্দিন, উপপরিদর্শক ফারুক ও মো. জামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট মাদারীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক জীবন বোস, রাজৈর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব কুমার দাস এবং সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা সুধাংশু কুমার গাইনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মিল্টন মন্ডল, তন্ময় গাইন ও সাকিব বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দীপক গাইন ও নীতিশ বসু। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়েছে; কিন্তু এ আয়োজনের প্রাণ ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় নয়, কোনো সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নয়—মানুষ এখানে এসেছিল আনন্দের অংশীদার হতে, অন্যের প্রতিভায় হাততালি দিতে এবং মিলেমিশে উৎসবের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

প্রতিভার বিকাশে পুরস্কার, আনন্দে সার্থকতা

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দলীয় নৃত্য, একক নৃত্য, একক সংগীত এবং কৌতুক ও অভিনয়—চারটি বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। কারও নৃত্যের ছন্দ, কারও কণ্ঠের মাধুর্য, কারও অভিনয় কিংবা কৌতুক দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে; আবার প্রতিযোগীদের প্রত্যেকের মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে নিজের প্রতিভাকে তুলে ধরার আন্তরিক চেষ্টা।

পুরস্কার বিতরণী পর্বে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দলীয় নৃত্য বিভাগে নিশান গ্রুপ প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি ফ্রিজ অর্জন করে। দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল ৩২ ইঞ্চি এলইডি স্মার্ট টিভি, তৃতীয় পুরস্কার ২৪ ইঞ্চি এলইডি টিভি, চতুর্থ পুরস্কার ২০ ইঞ্চি এলইডি টিভি এবং পঞ্চম পুরস্কার ১৮ ইঞ্চি এলইডি টিভি। একক নৃত্য বিভাগে ২৪ ইঞ্চি এলইডি টিভিসহ মোট আটটি টিভি এবং বিভিন্ন বিভাগে অসংখ্য আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

তবে পুরস্কারের জৌলুশের চেয়েও বড় ছিল প্রতিযোগীদের মুখের হাসি, বিজয়ীদের উচ্ছ্বাস এবং দর্শকদের করতালি। কারণ, একটি পুরস্কার হাতে পাওয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু স্বীকৃতি পাওয়ার স্মৃতি একজন শিশুর মনে দীর্ঘদিন সাহস জোগায়। আজ যে কিশোর-কিশোরী মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করছে, আগামী দিনে তার মধ্য থেকেই হয়তো উঠে আসবে কোনো শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী কিংবা সমাজকে আলোকিত করা কোনো মানুষ।

এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানোই এমন আয়োজনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

ধর্ম যার যার, আনন্দ সবার—সম্প্রীতিই হোক বাংলাদেশের পরিচয়

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসবের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো, এখানে উৎসবের আনন্দ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। গ্রামের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এ উৎসবে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন—বিশ্বাসের ভিন্নতা মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি করতে বাধ্য নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য থাকলে ভিন্ন পরিচয়ের মানুষও একই আনন্দে একত্র হতে পারে।

একটি শিশুর হাসির কোনো ধর্ম নেই। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় নেই। প্রতিবেশীর আনন্দে আনন্দিত হওয়া কিংবা তার দুঃখে সমব্যথী হওয়ার জন্য ধর্মীয় পরিচয় এক হওয়ারও প্রয়োজন নেই। মানুষের প্রতি মানুষের এই অকৃত্রিম অনুভূতিই আমাদের সামাজিক বন্ধনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

বাংলাদেশের হাজার বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের শিক্ষা দেয়। এ দেশের মাটি ও মানুষের ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, কিন্তু উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অধিকার ও সুযোগ সবার। এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি কেবল ব্যানারের শব্দ হয়ে থাকবে না; তা মানুষের জীবনাচরণে বাস্তব রূপ পাবে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সম্প্রীতি শুধু উৎসবের মঞ্চে পাশাপাশি বসা কিংবা একসঙ্গে ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সম্প্রীতি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রত্যেক মানুষ নিরাপদে নিজের ধর্ম পালন করতে পারে, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করে এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। উৎসবের বাইরেও এই মানবিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখাই আমাদের সবার কর্তব্য।

গ্রামবাংলার সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক মানুষের হৃদয়ে

গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে রাখে। একসময় গ্রামের মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন, লোকসংগীত, নৃত্য ও নাট্যচর্চা ছিল মানুষের আনন্দের অন্যতম উৎস। সময়ের পরিবর্তনে বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সম্মিলিত আনন্দের আকাঙ্ক্ষা আজও অমলিন।

এই বাস্তবতায় মৃধা বাড়ির মতো গ্রামীণ জনপদে রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ ধরনের উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে মুঠোফোনের পর্দার বাইরে এসে সরাসরি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সৃজনশীলতা বিকশিত করে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।

এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী গড়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পরিচিতি ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। উৎসব তখন শুধু কয়েক দিনের আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠবে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক বিকাশের অনুপ্রেরণা।

সভাপতির দায়িত্ব থেকে একটি মানবিক প্রত্যাশা

মৃধা বাড়ি সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দির কমিটির সভাপতি হিসেবে এ আয়োজনের তাৎপর্য উপলব্ধি করার একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি উৎসব সফল হওয়ার পেছনে আয়োজকদের শ্রম, শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা, অতিথিদের উপস্থিতি এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি প্রত্যাশা—মৃধা বাড়ির এ সম্প্রীতির ধারা আরও বিস্তৃত হোক। নতুন প্রজন্ম সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত হোক, সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাক এবং কোনো মানুষ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অবহেলা, বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।

আমাদের প্রত্যাশা, মৃধা বাড়ির এই মঞ্চ থেকে যে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, তা ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। উৎসবের আলো নিভে গেলেও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার আলো যেন কখনো নিভে না যায়।

উৎসব শেষ হয়, সম্প্রীতি যেন শেষ না হয়:

২৩ অক্টোবরের রাত থেকে ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা মৃধা বাড়ির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী শেষ হয়েছে। মঞ্চের আলো একসময় নিভে যাবে, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ থেমে যাবে, অতিথিরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ কর্মস্থলে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা আনন্দ, শিশু-কিশোরদের প্রাপ্তির স্মৃতি এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মুহূর্তগুলো থেকে যাবে দীর্ঘদিন।

এই স্মৃতিই হোক আগামী দিনের সম্প্রীতির পাথেয়।

দেবী দুর্গার আরাধনার অন্তর্নিহিত শিক্ষা অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর অভিযাত্রা। সেই শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করতে পারলেই দুর্গোৎসবের তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানো, ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকারকে সম্মান করা—এসব মানবিক কাজের মধ্য দিয়েই উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব হয়ে উঠবে।

মৃধা বাড়ির এই আয়োজন আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল যত উঁচুই হোক, আন্তরিক ভালোবাসা তার চেয়েও শক্তিশালী। ধর্মীয় পরিচয় আমাদের পৃথক করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা আমাদের এক করতে পারে। আর যে উৎসব মানুষকে মানুষের কাছে টেনে আনে, সেই উৎসবই সত্যিকার অর্থে সার্থক।

আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, অন্যের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করবে এবং সবাই মিলে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা সংখ্যালঘুতার পরিচয়ের চেয়ে বড় হবে মানুষের মর্যাদা। যেখানে উৎসব হবে সবার, আনন্দ হবে সবার, আর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে প্রতিটি মানুষের।

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব সেই স্বপ্নের পথেই একটি ছোট অথচ অর্থবহ পদক্ষেপ।

মানুষ মানুষের জন্য—সম্প্রীতি হোক আমাদের শক্তি, মানবিকতা হোক আমাদের ধর্ম, আর ভালোবাসা হোক সব উৎসবের চিরন্তন ভাষা।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব: সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধা এক রাত, আনন্দের অমলিন স্মৃতি।

ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মিলনমেলা, সংস্কৃতির উচ্ছ্বাসে মুখরিত গ্রামবাংলা—মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব যেন সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব: সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধা এক রাত, আনন্দের অমলিন স্মৃতি।

আপডেট সময় : ০৫:২৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

 

উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়? দেবীর আরাধনায়, আলোকসজ্জার ঝলমলে আয়োজনে, নাকি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অনাবিল আনন্দে? হয়তো সবকিছুর মধ্যেই উৎসবের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তবে উৎসব যখন ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়কে মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, তখনই তা হয়ে ওঠে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের মৃধা বাড়ি সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সেই মানবিক মিলনেরই এক আনন্দঘন দৃষ্টান্ত।

গত ২৩ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার রাত ১০টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনের আনন্দমুখর পরিবেশ গড়িয়ে যায় পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত। দীর্ঘ রাতের প্রতিটি প্রহর যেন আবদ্ধ ছিল গান, নৃত্য, অভিনয়, হাসি, উচ্ছ্বাস আর মানুষের আন্তরিক ভালোবাসায়। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মৃধা বাড়ি পরিণত হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।

এটি কেবল একটি পূজামণ্ডপের অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচিত হওয়ার, আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক আন্তরিক প্রয়াস।

আয়োজনের বর্ণাঢ্যতা, মানুষের ভালোবাসা

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গৌরাঙ্গ বসুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা কার এক্সপ্রেসের স্বত্বাধিকারী প্রাণতোষ মজুমদার, রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম, ওসি তদন্ত কুতুব উদ্দিন, উপপরিদর্শক ফারুক ও মো. জামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট মাদারীপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক জীবন বোস, রাজৈর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব কুমার দাস এবং সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা সুধাংশু কুমার গাইনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মিল্টন মন্ডল, তন্ময় গাইন ও সাকিব বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দীপক গাইন ও নীতিশ বসু। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট গৌরাঙ্গ বসু।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়েছে; কিন্তু এ আয়োজনের প্রাণ ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় নয়, কোনো সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নয়—মানুষ এখানে এসেছিল আনন্দের অংশীদার হতে, অন্যের প্রতিভায় হাততালি দিতে এবং মিলেমিশে উৎসবের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

প্রতিভার বিকাশে পুরস্কার, আনন্দে সার্থকতা

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দলীয় নৃত্য, একক নৃত্য, একক সংগীত এবং কৌতুক ও অভিনয়—চারটি বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। কারও নৃত্যের ছন্দ, কারও কণ্ঠের মাধুর্য, কারও অভিনয় কিংবা কৌতুক দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে; আবার প্রতিযোগীদের প্রত্যেকের মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে নিজের প্রতিভাকে তুলে ধরার আন্তরিক চেষ্টা।

পুরস্কার বিতরণী পর্বে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দলীয় নৃত্য বিভাগে নিশান গ্রুপ প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি ফ্রিজ অর্জন করে। দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল ৩২ ইঞ্চি এলইডি স্মার্ট টিভি, তৃতীয় পুরস্কার ২৪ ইঞ্চি এলইডি টিভি, চতুর্থ পুরস্কার ২০ ইঞ্চি এলইডি টিভি এবং পঞ্চম পুরস্কার ১৮ ইঞ্চি এলইডি টিভি। একক নৃত্য বিভাগে ২৪ ইঞ্চি এলইডি টিভিসহ মোট আটটি টিভি এবং বিভিন্ন বিভাগে অসংখ্য আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

তবে পুরস্কারের জৌলুশের চেয়েও বড় ছিল প্রতিযোগীদের মুখের হাসি, বিজয়ীদের উচ্ছ্বাস এবং দর্শকদের করতালি। কারণ, একটি পুরস্কার হাতে পাওয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু স্বীকৃতি পাওয়ার স্মৃতি একজন শিশুর মনে দীর্ঘদিন সাহস জোগায়। আজ যে কিশোর-কিশোরী মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করছে, আগামী দিনে তার মধ্য থেকেই হয়তো উঠে আসবে কোনো শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী কিংবা সমাজকে আলোকিত করা কোনো মানুষ।

এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানোই এমন আয়োজনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

ধর্ম যার যার, আনন্দ সবার—সম্প্রীতিই হোক বাংলাদেশের পরিচয়

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসবের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো, এখানে উৎসবের আনন্দ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। গ্রামের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এ উৎসবে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন—বিশ্বাসের ভিন্নতা মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি করতে বাধ্য নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য থাকলে ভিন্ন পরিচয়ের মানুষও একই আনন্দে একত্র হতে পারে।

একটি শিশুর হাসির কোনো ধর্ম নেই। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় নেই। প্রতিবেশীর আনন্দে আনন্দিত হওয়া কিংবা তার দুঃখে সমব্যথী হওয়ার জন্য ধর্মীয় পরিচয় এক হওয়ারও প্রয়োজন নেই। মানুষের প্রতি মানুষের এই অকৃত্রিম অনুভূতিই আমাদের সামাজিক বন্ধনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

বাংলাদেশের হাজার বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের শিক্ষা দেয়। এ দেশের মাটি ও মানুষের ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, কিন্তু উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অধিকার ও সুযোগ সবার। এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি কেবল ব্যানারের শব্দ হয়ে থাকবে না; তা মানুষের জীবনাচরণে বাস্তব রূপ পাবে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সম্প্রীতি শুধু উৎসবের মঞ্চে পাশাপাশি বসা কিংবা একসঙ্গে ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সম্প্রীতি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রত্যেক মানুষ নিরাপদে নিজের ধর্ম পালন করতে পারে, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করে এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। উৎসবের বাইরেও এই মানবিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখাই আমাদের সবার কর্তব্য।

গ্রামবাংলার সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক মানুষের হৃদয়ে

গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে রাখে। একসময় গ্রামের মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন, লোকসংগীত, নৃত্য ও নাট্যচর্চা ছিল মানুষের আনন্দের অন্যতম উৎস। সময়ের পরিবর্তনে বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সম্মিলিত আনন্দের আকাঙ্ক্ষা আজও অমলিন।

এই বাস্তবতায় মৃধা বাড়ির মতো গ্রামীণ জনপদে রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ ধরনের উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে মুঠোফোনের পর্দার বাইরে এসে সরাসরি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সৃজনশীলতা বিকশিত করে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।

এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী গড়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পরিচিতি ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। উৎসব তখন শুধু কয়েক দিনের আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠবে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক বিকাশের অনুপ্রেরণা।

সভাপতির দায়িত্ব থেকে একটি মানবিক প্রত্যাশা

মৃধা বাড়ি সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দির কমিটির সভাপতি হিসেবে এ আয়োজনের তাৎপর্য উপলব্ধি করার একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি উৎসব সফল হওয়ার পেছনে আয়োজকদের শ্রম, শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা, অতিথিদের উপস্থিতি এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি প্রত্যাশা—মৃধা বাড়ির এ সম্প্রীতির ধারা আরও বিস্তৃত হোক। নতুন প্রজন্ম সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত হোক, সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাক এবং কোনো মানুষ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অবহেলা, বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।

আমাদের প্রত্যাশা, মৃধা বাড়ির এই মঞ্চ থেকে যে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, তা ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। উৎসবের আলো নিভে গেলেও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার আলো যেন কখনো নিভে না যায়।

উৎসব শেষ হয়, সম্প্রীতি যেন শেষ না হয়:

২৩ অক্টোবরের রাত থেকে ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা মৃধা বাড়ির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী শেষ হয়েছে। মঞ্চের আলো একসময় নিভে যাবে, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ থেমে যাবে, অতিথিরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ কর্মস্থলে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা আনন্দ, শিশু-কিশোরদের প্রাপ্তির স্মৃতি এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মুহূর্তগুলো থেকে যাবে দীর্ঘদিন।

এই স্মৃতিই হোক আগামী দিনের সম্প্রীতির পাথেয়।

দেবী দুর্গার আরাধনার অন্তর্নিহিত শিক্ষা অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর অভিযাত্রা। সেই শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করতে পারলেই দুর্গোৎসবের তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানো, ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকারকে সম্মান করা—এসব মানবিক কাজের মধ্য দিয়েই উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব হয়ে উঠবে।

মৃধা বাড়ির এই আয়োজন আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল যত উঁচুই হোক, আন্তরিক ভালোবাসা তার চেয়েও শক্তিশালী। ধর্মীয় পরিচয় আমাদের পৃথক করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা আমাদের এক করতে পারে। আর যে উৎসব মানুষকে মানুষের কাছে টেনে আনে, সেই উৎসবই সত্যিকার অর্থে সার্থক।

আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, অন্যের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করবে এবং সবাই মিলে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা সংখ্যালঘুতার পরিচয়ের চেয়ে বড় হবে মানুষের মর্যাদা। যেখানে উৎসব হবে সবার, আনন্দ হবে সবার, আর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে প্রতিটি মানুষের।

মৃধা বাড়ির দুর্গোৎসব সেই স্বপ্নের পথেই একটি ছোট অথচ অর্থবহ পদক্ষেপ।

মানুষ মানুষের জন্য—সম্প্রীতি হোক আমাদের শক্তি, মানবিকতা হোক আমাদের ধর্ম, আর ভালোবাসা হোক সব উৎসবের চিরন্তন ভাষা।