ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা খুলনায় মুদি দোকানিকে গুলি, পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে খুলনায় সন্ধানী ক্লিনিক লক্ষ্য করে গুলি, ভাঙচুর সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পদায়ন পেলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়  ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে নারায়ণগঞ্জ সদরে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও খাল খনন পঞ্চগড়ে মামলার বেড়াজালে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী পুলিশ সুপারের কাছে গণঅভিযোগ এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ যুব ও কর্মসংস্থান সম্পাদক হলেন খুলনার ওয়াহিদুজ্জামান খুলনায় চোর সন্দেহে যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মাটি খুঁড়ে মিলল ১০ হাজার ইয়াবা, বাজারমূল্য ৩০ লাখ টাকা নেত্রকোনায় কালের কণ্ঠের সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি

স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা

  • হাসান হাওলাদার
  • আপডেট সময় : ১২:২৭:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৩ জন সংবাদটি পড়েছেন

স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা**

 

হাসান হাওলাদার | বিশেষ প্রতিবেদন

 

বাংলাদেশে পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য কর্মপরিবেশ দিন দিন আরও ভয়ংকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অপরাধের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত শারীরিক হামলা, হত্যা মামলা, সাইবার আইনের অপব্যবহার এবং নানামুখী হয়রানির শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একদিকে যেমন মাদক চক্র, কিশোর গ্যাং ও প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সশস্ত্র হামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের বেপরোয়া আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এক উদ্বেগজনক ও অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে।

১. পরিসংখ্যানের চোখে বিপন্ন সাংবাদিকতা

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ মাসে ৪৫ জন সাংবাদিক গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৪২ জনকে শারীরিকভাবে জখম করা হয়েছে এবং ৩ জনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ প্রতিবেদন বলছে, বছরের প্রথম প্রান্তিক তথা জানুয়ারি-মার্চ সময়ের মধ্যেই অন্তত ১০৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হামলা ও হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ মে মাসের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্ট (বিএজে) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল মে মাসেই দেশের অন্তত ৫৫ জন সংবাদকর্মী নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১টি পৃথক ঘটনায় ৩৮ জন সাংবাদিকের ওপর চালানো হয়েছে বর্বর শারীরিক নির্যাতন।

 

 ২. রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলের আক্রমণ: কাঠগড়ায় সব পক্ষ

কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষ নয়, বরং রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের হাতেও লাঞ্ছিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। মে মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

 রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তাণ্ডব:দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৯ জন সাংবাদিক। পাবনা ও লালমনিরহাটে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় ৩ জন এবং নরসিংদীতে যুবদল নেতার মারধরের শিকার হয়েছেন ২ জন সাংবাদিক। বরিশালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নেতৃত্বে এক সাংবাদিককে পিটিয়ে তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া বগুড়ায় যুবলীগ এবং কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ৩ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন। নোয়াখালীতে একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মানববন্ধনের সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন এক যুবদল নেতা।

 আইনজীবী ও শিক্ষকদের হামলা: চট্টগ্রামে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন চলাকালে আইনজীবীদের হাতে ৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। ময়মনসিংহে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তার দলবল এবং পটুয়াখালীর পীরগাছায় শিক্ষকদের হামলায় আরও ৩ জন সাংবাদিক আহত হন।

 ঠিকাদার ও অপরাধী চক্র: কালিহাতী ও ফরিদপুরে উন্নয়ন কাজের অনিয়মের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ঠিকাদারদের হাতে ২ জন এবং মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ১ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হন।

 

৩. রক্ষক যখন ভক্ষক: আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা

যাদের ওপর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।

মে মাসে চট্টগ্রামে আসামিকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে ২ জন সংবাদকর্মী গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহকালে পুলিশ সদস্যরা প্রকাশ্যেই ২ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায়। মে মাসে পুলিশ খাগড়াছড়িতে এবং র‍্যাব ময়মনসিংহে ১ জন করে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। এমনকি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে এক সাংবাদিকের বিদেশযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করেছে।

 

৪. মাঠপর্যায়ের কিছু ভয়াবহ খণ্ডচিত্র

 সাভার (২২ মে) পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাওয়া বেসরকারি টেলিভিশন ‘দেশ টিভি’ ও ‘এসএ টিভি’-র সাংবাদিকদের ওপর মাদক চক্রের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে ২ জন সাংবাদিক গুরুতর ছুরিকাহত হন এবং টিমের অন্য সদস্যরা চরম হেনস্তার শিকার হন।

 মগবাজার ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল (৩০ মে) রাজধানীর মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং আদ-দ্বীন হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্টাফ এবং নিরাপত্তা কর্মীদের হামলায় মোট ৮ জন সাংবাদিক আহত হন।

নরসিংদী (জানুয়ারি) বছরের শুরুতেই নরসিংদীতে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের ওপর স্থানীয় গ্যাংয়ের বর্বরোচিত হামলায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন।

 

৫. আইনি হয়রানির নতুন হাতিয়ার: মিথ্যা মামলা ও ‘সাইবার অ্যাক্ট’

শারীরিক হামলার পাশাপাশি সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে মিথ্যা মামলা। বিগত মাসগুলোতে ১৪০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক আইনসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন একসঙ্গে ৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করেছেন। এছাড়া টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা করা হয়েছে। জাতীয় দৈনিক বিজনেস ফাইল পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধির নামেও চাঁদাবাজি ও ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নিশাত আফরিন এমিলা’ নামের একটি ফাঁদ ব্যবহার করে সাংবাদিক মাহাবুব হাওলাদারকে অপহরণ ও হত্যার চেষ্টা চালানো হলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া বনের জমি দখল নিয়ে সংবাদ করায় বন কর্মকর্তা এক সাংবাদিককে মামলা ও লাগাতার হয়রানির হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ‘এডিটরস কাউন্সিল’ (সম্পাদক পরিষদ) ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন শীর্ষ সংগঠন সরকারের প্রতি এসব মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

 ৬. পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ: স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী?

মানবাধিকার সংস্থা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার এই দীর্ঘ তালিকা শুধু কোনো সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি দেশের মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর এক পরিকল্পিত ও বড় ধরনের আঘাত।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্ট (বিএজে) তাদের প্রতিবেদনে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনা না হলে এই পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার এই অপসংস্কৃতি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের চরম আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ।

Tag :
About Author Information

Ahad Staff

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা

স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা

আপডেট সময় : ১২:২৭:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা**

 

হাসান হাওলাদার | বিশেষ প্রতিবেদন

 

বাংলাদেশে পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য কর্মপরিবেশ দিন দিন আরও ভয়ংকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অপরাধের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত শারীরিক হামলা, হত্যা মামলা, সাইবার আইনের অপব্যবহার এবং নানামুখী হয়রানির শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একদিকে যেমন মাদক চক্র, কিশোর গ্যাং ও প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সশস্ত্র হামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের বেপরোয়া আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এক উদ্বেগজনক ও অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে।

১. পরিসংখ্যানের চোখে বিপন্ন সাংবাদিকতা

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ মাসে ৪৫ জন সাংবাদিক গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৪২ জনকে শারীরিকভাবে জখম করা হয়েছে এবং ৩ জনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ প্রতিবেদন বলছে, বছরের প্রথম প্রান্তিক তথা জানুয়ারি-মার্চ সময়ের মধ্যেই অন্তত ১০৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হামলা ও হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ মে মাসের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্ট (বিএজে) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল মে মাসেই দেশের অন্তত ৫৫ জন সংবাদকর্মী নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১টি পৃথক ঘটনায় ৩৮ জন সাংবাদিকের ওপর চালানো হয়েছে বর্বর শারীরিক নির্যাতন।

 

 ২. রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলের আক্রমণ: কাঠগড়ায় সব পক্ষ

কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষ নয়, বরং রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের হাতেও লাঞ্ছিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। মে মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

 রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তাণ্ডব:দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৯ জন সাংবাদিক। পাবনা ও লালমনিরহাটে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় ৩ জন এবং নরসিংদীতে যুবদল নেতার মারধরের শিকার হয়েছেন ২ জন সাংবাদিক। বরিশালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নেতৃত্বে এক সাংবাদিককে পিটিয়ে তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া বগুড়ায় যুবলীগ এবং কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ৩ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন। নোয়াখালীতে একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মানববন্ধনের সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন এক যুবদল নেতা।

 আইনজীবী ও শিক্ষকদের হামলা: চট্টগ্রামে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন চলাকালে আইনজীবীদের হাতে ৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। ময়মনসিংহে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তার দলবল এবং পটুয়াখালীর পীরগাছায় শিক্ষকদের হামলায় আরও ৩ জন সাংবাদিক আহত হন।

 ঠিকাদার ও অপরাধী চক্র: কালিহাতী ও ফরিদপুরে উন্নয়ন কাজের অনিয়মের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ঠিকাদারদের হাতে ২ জন এবং মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ১ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হন।

 

৩. রক্ষক যখন ভক্ষক: আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা

যাদের ওপর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।

মে মাসে চট্টগ্রামে আসামিকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে ২ জন সংবাদকর্মী গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহকালে পুলিশ সদস্যরা প্রকাশ্যেই ২ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায়। মে মাসে পুলিশ খাগড়াছড়িতে এবং র‍্যাব ময়মনসিংহে ১ জন করে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। এমনকি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে এক সাংবাদিকের বিদেশযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করেছে।

 

৪. মাঠপর্যায়ের কিছু ভয়াবহ খণ্ডচিত্র

 সাভার (২২ মে) পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাওয়া বেসরকারি টেলিভিশন ‘দেশ টিভি’ ও ‘এসএ টিভি’-র সাংবাদিকদের ওপর মাদক চক্রের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে ২ জন সাংবাদিক গুরুতর ছুরিকাহত হন এবং টিমের অন্য সদস্যরা চরম হেনস্তার শিকার হন।

 মগবাজার ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল (৩০ মে) রাজধানীর মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং আদ-দ্বীন হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্টাফ এবং নিরাপত্তা কর্মীদের হামলায় মোট ৮ জন সাংবাদিক আহত হন।

নরসিংদী (জানুয়ারি) বছরের শুরুতেই নরসিংদীতে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের ওপর স্থানীয় গ্যাংয়ের বর্বরোচিত হামলায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন।

 

৫. আইনি হয়রানির নতুন হাতিয়ার: মিথ্যা মামলা ও ‘সাইবার অ্যাক্ট’

শারীরিক হামলার পাশাপাশি সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে মিথ্যা মামলা। বিগত মাসগুলোতে ১৪০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক আইনসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন একসঙ্গে ৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করেছেন। এছাড়া টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা করা হয়েছে। জাতীয় দৈনিক বিজনেস ফাইল পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধির নামেও চাঁদাবাজি ও ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নিশাত আফরিন এমিলা’ নামের একটি ফাঁদ ব্যবহার করে সাংবাদিক মাহাবুব হাওলাদারকে অপহরণ ও হত্যার চেষ্টা চালানো হলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া বনের জমি দখল নিয়ে সংবাদ করায় বন কর্মকর্তা এক সাংবাদিককে মামলা ও লাগাতার হয়রানির হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ‘এডিটরস কাউন্সিল’ (সম্পাদক পরিষদ) ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন শীর্ষ সংগঠন সরকারের প্রতি এসব মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

 ৬. পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ: স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী?

মানবাধিকার সংস্থা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার এই দীর্ঘ তালিকা শুধু কোনো সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি দেশের মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর এক পরিকল্পিত ও বড় ধরনের আঘাত।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্ট (বিএজে) তাদের প্রতিবেদনে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনা না হলে এই পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার এই অপসংস্কৃতি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের চরম আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ।