ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ:
পার্বতীপুরে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আটক ১ বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমা: আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও সম্প্রীতির উৎসব  বেনাপোলে বিজিবি’র অভিযানে ভারতীয় বিভিন্ন চোরাচালান মালামাল আটক রাজশাহীতে সরকারি রাস্তা দখল নিয়ে সংঘর্ষে সংবাদকর্মীসহ আহত ৩, থানায় মামলা গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এর জটিকা মিশিল, পুলিশের গাড়িতে হামলা দুই পুলিশ সদস্য কে মারধর। স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরছে হামলা ও মিথ্যা মামলা: বিপন্ন গণমাধ্যম, আতঙ্কে সংবাদকর্মীরা খুলনায় মুদি দোকানিকে গুলি, পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে খুলনায় সন্ধানী ক্লিনিক লক্ষ্য করে গুলি, ভাঙচুর সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পদায়ন পেলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়  ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে নারায়ণগঞ্জ সদরে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও খাল খনন
উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন—এটি কি খুব বড় কোনো দাবি?

মিটফোর্ডের মিনিয়ালস কোয়ার্টার: আজকের নাগরিক সমাবেশ যে প্রশ্নটি রেখে গেল।

 

একটি ঘর ভাঙার আগে সেই ঘরের মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের কাছে অসম্ভব?

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টা। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ১ নম্বর মিনিয়ালস কোয়ার্টার বা সুইপার কলোনি উচ্ছেদের প্রতিবাদ এবং সারাদেশে হরিজন কলোনি উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমাবেশ।

এটি নিছক আরেকটি সমাবেশ ছিল না। আজকের এই নাগরিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি অবহেলিত প্রশ্ন আবারও রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সামনে উচ্চারিত হয়েছে—

উন্নয়ন হবে, হাসপাতাল আধুনিক হবে—কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য কি দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী কিছু প্রান্তিক পরিবারকে গৃহহীন হয়ে?

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পরেশ মজুমদার এবং পরিচালনা করেন রিঙ্কু শর্মা। বক্তব্য রাখেন চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, ছাত্রনেতা এবং হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। ডা. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, জাকির হোসেন, শামসুল হুদা, বজলুর রশিদ ফিরোজ, জামশেদ আনোয়ার তপন, অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাসসহ বিভিন্ন বক্তা মিটফোর্ডের বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানান।

আজকের সমাবেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘আমরা যাব কোথায়?’

সমাবেশে বক্তারা যে বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিটফোর্ড হাসপাতালের মিনিয়ালস কোয়ার্টারে হরিজন সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে। দীর্ঘদিনের এই বসতির সঙ্গে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সেবার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০টি পরিবার বসবাস করছে বলে সমাবেশে জানানো হয়েছে।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে নোটিশ দিয়ে ৩০ আগস্টের মধ্যে কোয়ার্টার খালি করার নির্দেশ দেয় এবং ৩১ আগস্ট থেকে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা জানানো হয়—এমন তথ্য আগের প্রতিবেদনগুলোতেও এসেছে।

আজকের নাগরিক সমাবেশ সেই নোটিশের বিরুদ্ধেই শুধু প্রতিবাদ জানায়নি; বরং প্রশ্ন তুলেছে—পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।

একটি নোটিশ কি ১৬৮ বছরের স্মৃতি মুছে দিতে পারে?

১৬৮ বছর—একটি মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ একটি সময়।

সমাবেশে বক্তারা দাবি করেছেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হরিজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পরিবারগুলো প্রায় ১৬৮ বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে।

এই সময়ের প্রতিটি বছর হয়তো সরকারি নথিতে লেখা নেই। কিন্তু একটি পরিবারের স্মৃতিতে লেখা আছে।

কোনো শিশুর প্রথম হাঁটা সেখানে।

কোনো মায়ের সন্তান জন্মের স্মৃতি সেখানে।

কোনো বাবার সারাজীবনের শ্রম সেখানে।

কোনো বৃদ্ধের শেষ আশ্রয়ও হয়তো সেই ঘরটি।

তাই একটি প্রশাসনিক নোটিশের কয়েকটি লাইনে সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না।

অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি বসবাস, কোয়ার্টার বরাদ্দ, কর্মসংস্থান ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়গুলো যথাযথ সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি এসবের প্রমাণ থাকে, তাহলে তাঁদের উচ্ছেদের প্রশ্নটি নিছক ‘স্থাপনা খালি করার’ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে মানুষের বাস্তব জীবনটি আড়ালে পড়ে যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হলে নতুন ভবন হোক—কিন্তু মানুষগুলোও থাকুক নিরাপদে

মিটফোর্ড হাসপাতালের ভবন যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মানুষের জীবন কোনোভাবেই ঝুঁকির মধ্যে রাখা যায় না।

কিন্তু একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের সঙ্গে একটি পরিবারকে গৃহহীন করে দেওয়া এক বিষয় নয়।

ভবন ভাঙার আগে বিকল্প বাসস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

নতুন ভবন করার আগে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব।

উন্নয়ন করা সম্ভব মানুষকে সঙ্গে নিয়েই।

আজকের নাগরিক সমাবেশের দাবি মূলত এখানেই।

তাঁরা উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন না। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন উন্নয়নের পদ্ধতি নিয়ে।

‘মিটফোর্ড উন্নত হোক—কিন্তু আমরা কোথায় যাব?’

এ প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

যাঁরা হাসপাতালকে পরিষ্কার রাখেন, তাঁদের জীবন কি এতটাই অদৃশ্য?

হাসপাতালে চিকিৎসককে আমরা দেখি। নার্সকে দেখি। প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেখি।

কিন্তু যে মানুষটি ভোরে উঠে হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করেন, রোগীর বর্জ্য সরান, জীবাণুর ঝুঁকি নেন—তাঁকে আমরা কতটা দেখি?

এই মানুষগুলো না থাকলে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন।

করোনার ভয়াবহ সময়েও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা অন্যের জীবন রক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছেন।

অথচ আজ তাঁদের নিজেদের জীবন ও আবাসনই যখন অনিশ্চিত, তখন সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করতেই হয়—

যাঁরা অন্যের জন্য হাসপাতালকে নিরাপদ রাখলেন, তাঁদের নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় কি আমরা নিশ্চিত করতে পারি না?

আজকের নাগরিক সমাবেশ শুধু মিটফোর্ডের জন্য নয়

আজকের সমাবেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধু মিটফোর্ডের ৬০টি পরিবারের প্রশ্নকে সামনে আনেনি; সারাদেশের হরিজন কলোনিগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলেছে।

এর আগে আগস্টে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং সেপ্টেম্বরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে একই দাবি উঠে এসেছে—পুনর্বাসন ছাড়া মিটফোর্ডের হরিজন পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা যাবে না।

অর্থাৎ আজকের নাগরিক সমাবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ধারাবাহিক নাগরিক উদ্বেগেরই পরবর্তী প্রকাশ।

এখন প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি এই নাগরিক উদ্বেগকে শুনবে?

সংবিধানের চেতনা: মানুষকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করেছে এবং ২৮ অনুচ্ছেদ বৈষম্যবিরোধী নীতি ঘোষণা করেছে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনগত সুরক্ষা এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে সুরক্ষিত করেছে।

অতএব, কোনো উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার, ন্যায্য প্রক্রিয়া, শুনানির সুযোগ এবং মানবিক পরিণতিও বিবেচনায় আসা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের শক্তি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে দুর্বল মানুষের কথাও শোনে।

আজকের দুই দফা দাবি—আসলে একটি মানবিক রাষ্ট্রের দাবি

নাগরিক সমাবেশ থেকে যে দাবিগুলো উঠেছে, তার মধ্যে প্রধান দুটি হলো—

প্রথমত, অবিলম্বে উচ্ছেদ নোটিশ কার্যকর স্থগিত করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ বা ভবন অপসারণ কার্যক্রম চালানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, হরিজন সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

দাবি দুটির মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে—মানুষকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়।

এখন দরকার মুখোমুখি অবস্থান নয়, সমাধানের টেবিল

আমরা মনে করি, এই সংকটের সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলুক—ভবনগুলোর প্রকৃত অবস্থা কী।

স্বাধীন প্রকৌশলগত মূল্যায়ন হোক।

প্রতিটি পরিবারের তথ্য যাচাই করা হোক।

বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা হোক।

পুনর্বাসনের স্থান নির্ধারণ করা হোক।

প্রয়োজনে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।

এবং সবশেষে একটি লিখিত, সময়বদ্ধ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হোক।

আগে নিরাপদ ঠিকানা—তারপর উচ্ছেদ।

এটাই হতে পারে মানবিক সমাধানের পথ।

আজ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশ হয়তো শেষ হয়ে গেছে। বক্তারা তাঁদের কথা বলেছেন। দাবিগুলো তুলে ধরেছেন। মানুষ হয়তো ঘরে ফিরে গেছে।

কিন্তু সমাবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে গেছে—

মিটফোর্ডের সেই পরিবারগুলো যাবে কোথায়?

এই প্রশ্ন শুধু তাঁদের নয়।

এটি আমাদের প্রশ্ন।

এটি রাষ্ট্রের প্রশ্ন।

এটি বিবেকের প্রশ্ন।

উন্নয়ন হোক—কেউ তার বিরোধিতা করে না।

মিটফোর্ড হাসপাতাল আধুনিক হোক—আমরাও চাই।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ হোক—প্রয়োজন হলে অবশ্যই হোক।

কিন্তু—

মানুষকে গৃহহীন করে নয়।

প্রান্তিক মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে নয়।

পুনর্বাসনের পথ বন্ধ করে নয়।

যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের হাসপাতাল পরিষ্কার করেছেন, তাঁর নিজের ঘর ভাঙার আগে অন্তত তাঁর ভবিষ্যতের একটি ঠিকানা নিশ্চিত করা হোক।

কারণ—

একটি হাসপাতাল শুধু ভবন নয়, মানুষের আশ্রয়ও।

একটি শহর শুধু রাস্তা-দালান নয়, মানুষের জীবনও।

আর একটি রাষ্ট্র শুধু প্রশাসনিক আদেশ নয়—মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারেরও নাম।

আজকের নাগরিক সমাবেশ তাই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট আহ্বান রেখে গেল—

‘উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন চাই; উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা চাই।’

এই দাবি কোনো একক সম্প্রদায়ের দাবি নয়।

এটি এমন একটি রাষ্ট্রের দাবি, যে রাষ্ট্র উন্নয়ন করবে—কিন্তু কাউকে পেছনে ফেলে নয়।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক‌‌‌ ও মানবাধিকার কর্মী।

Tag :
About Author Information

GOURANGA BOSE

জনপ্রিয় সংবাদ

পার্বতীপুরে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আটক ১

উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন—এটি কি খুব বড় কোনো দাবি?

মিটফোর্ডের মিনিয়ালস কোয়ার্টার: আজকের নাগরিক সমাবেশ যে প্রশ্নটি রেখে গেল।

আপডেট সময় : ০৭:০৭:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

একটি ঘর ভাঙার আগে সেই ঘরের মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের কাছে অসম্ভব?

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টা। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ১ নম্বর মিনিয়ালস কোয়ার্টার বা সুইপার কলোনি উচ্ছেদের প্রতিবাদ এবং সারাদেশে হরিজন কলোনি উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমাবেশ।

এটি নিছক আরেকটি সমাবেশ ছিল না। আজকের এই নাগরিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি অবহেলিত প্রশ্ন আবারও রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সামনে উচ্চারিত হয়েছে—

উন্নয়ন হবে, হাসপাতাল আধুনিক হবে—কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য কি দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী কিছু প্রান্তিক পরিবারকে গৃহহীন হয়ে?

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পরেশ মজুমদার এবং পরিচালনা করেন রিঙ্কু শর্মা। বক্তব্য রাখেন চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, ছাত্রনেতা এবং হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। ডা. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, জাকির হোসেন, শামসুল হুদা, বজলুর রশিদ ফিরোজ, জামশেদ আনোয়ার তপন, অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাসসহ বিভিন্ন বক্তা মিটফোর্ডের বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানান।

আজকের সমাবেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘আমরা যাব কোথায়?’

সমাবেশে বক্তারা যে বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিটফোর্ড হাসপাতালের মিনিয়ালস কোয়ার্টারে হরিজন সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে। দীর্ঘদিনের এই বসতির সঙ্গে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সেবার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০টি পরিবার বসবাস করছে বলে সমাবেশে জানানো হয়েছে।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে নোটিশ দিয়ে ৩০ আগস্টের মধ্যে কোয়ার্টার খালি করার নির্দেশ দেয় এবং ৩১ আগস্ট থেকে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা জানানো হয়—এমন তথ্য আগের প্রতিবেদনগুলোতেও এসেছে।

আজকের নাগরিক সমাবেশ সেই নোটিশের বিরুদ্ধেই শুধু প্রতিবাদ জানায়নি; বরং প্রশ্ন তুলেছে—পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।

একটি নোটিশ কি ১৬৮ বছরের স্মৃতি মুছে দিতে পারে?

১৬৮ বছর—একটি মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ একটি সময়।

সমাবেশে বক্তারা দাবি করেছেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হরিজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পরিবারগুলো প্রায় ১৬৮ বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে।

এই সময়ের প্রতিটি বছর হয়তো সরকারি নথিতে লেখা নেই। কিন্তু একটি পরিবারের স্মৃতিতে লেখা আছে।

কোনো শিশুর প্রথম হাঁটা সেখানে।

কোনো মায়ের সন্তান জন্মের স্মৃতি সেখানে।

কোনো বাবার সারাজীবনের শ্রম সেখানে।

কোনো বৃদ্ধের শেষ আশ্রয়ও হয়তো সেই ঘরটি।

তাই একটি প্রশাসনিক নোটিশের কয়েকটি লাইনে সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না।

অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি বসবাস, কোয়ার্টার বরাদ্দ, কর্মসংস্থান ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়গুলো যথাযথ সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি এসবের প্রমাণ থাকে, তাহলে তাঁদের উচ্ছেদের প্রশ্নটি নিছক ‘স্থাপনা খালি করার’ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে মানুষের বাস্তব জীবনটি আড়ালে পড়ে যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হলে নতুন ভবন হোক—কিন্তু মানুষগুলোও থাকুক নিরাপদে

মিটফোর্ড হাসপাতালের ভবন যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মানুষের জীবন কোনোভাবেই ঝুঁকির মধ্যে রাখা যায় না।

কিন্তু একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের সঙ্গে একটি পরিবারকে গৃহহীন করে দেওয়া এক বিষয় নয়।

ভবন ভাঙার আগে বিকল্প বাসস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

নতুন ভবন করার আগে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব।

উন্নয়ন করা সম্ভব মানুষকে সঙ্গে নিয়েই।

আজকের নাগরিক সমাবেশের দাবি মূলত এখানেই।

তাঁরা উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন না। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন উন্নয়নের পদ্ধতি নিয়ে।

‘মিটফোর্ড উন্নত হোক—কিন্তু আমরা কোথায় যাব?’

এ প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

যাঁরা হাসপাতালকে পরিষ্কার রাখেন, তাঁদের জীবন কি এতটাই অদৃশ্য?

হাসপাতালে চিকিৎসককে আমরা দেখি। নার্সকে দেখি। প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেখি।

কিন্তু যে মানুষটি ভোরে উঠে হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করেন, রোগীর বর্জ্য সরান, জীবাণুর ঝুঁকি নেন—তাঁকে আমরা কতটা দেখি?

এই মানুষগুলো না থাকলে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন।

করোনার ভয়াবহ সময়েও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা অন্যের জীবন রক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছেন।

অথচ আজ তাঁদের নিজেদের জীবন ও আবাসনই যখন অনিশ্চিত, তখন সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করতেই হয়—

যাঁরা অন্যের জন্য হাসপাতালকে নিরাপদ রাখলেন, তাঁদের নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় কি আমরা নিশ্চিত করতে পারি না?

আজকের নাগরিক সমাবেশ শুধু মিটফোর্ডের জন্য নয়

আজকের সমাবেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধু মিটফোর্ডের ৬০টি পরিবারের প্রশ্নকে সামনে আনেনি; সারাদেশের হরিজন কলোনিগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলেছে।

এর আগে আগস্টে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং সেপ্টেম্বরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে একই দাবি উঠে এসেছে—পুনর্বাসন ছাড়া মিটফোর্ডের হরিজন পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা যাবে না।

অর্থাৎ আজকের নাগরিক সমাবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ধারাবাহিক নাগরিক উদ্বেগেরই পরবর্তী প্রকাশ।

এখন প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি এই নাগরিক উদ্বেগকে শুনবে?

সংবিধানের চেতনা: মানুষকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করেছে এবং ২৮ অনুচ্ছেদ বৈষম্যবিরোধী নীতি ঘোষণা করেছে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনগত সুরক্ষা এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে সুরক্ষিত করেছে।

অতএব, কোনো উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা বা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার, ন্যায্য প্রক্রিয়া, শুনানির সুযোগ এবং মানবিক পরিণতিও বিবেচনায় আসা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের শক্তি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে দুর্বল মানুষের কথাও শোনে।

আজকের দুই দফা দাবি—আসলে একটি মানবিক রাষ্ট্রের দাবি

নাগরিক সমাবেশ থেকে যে দাবিগুলো উঠেছে, তার মধ্যে প্রধান দুটি হলো—

প্রথমত, অবিলম্বে উচ্ছেদ নোটিশ কার্যকর স্থগিত করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ বা ভবন অপসারণ কার্যক্রম চালানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, হরিজন সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

দাবি দুটির মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে—মানুষকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন নয়।

এখন দরকার মুখোমুখি অবস্থান নয়, সমাধানের টেবিল

আমরা মনে করি, এই সংকটের সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলুক—ভবনগুলোর প্রকৃত অবস্থা কী।

স্বাধীন প্রকৌশলগত মূল্যায়ন হোক।

প্রতিটি পরিবারের তথ্য যাচাই করা হোক।

বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা হোক।

পুনর্বাসনের স্থান নির্ধারণ করা হোক।

প্রয়োজনে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।

এবং সবশেষে একটি লিখিত, সময়বদ্ধ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হোক।

আগে নিরাপদ ঠিকানা—তারপর উচ্ছেদ।

এটাই হতে পারে মানবিক সমাধানের পথ।

আজ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সমাবেশ হয়তো শেষ হয়ে গেছে। বক্তারা তাঁদের কথা বলেছেন। দাবিগুলো তুলে ধরেছেন। মানুষ হয়তো ঘরে ফিরে গেছে।

কিন্তু সমাবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে গেছে—

মিটফোর্ডের সেই পরিবারগুলো যাবে কোথায়?

এই প্রশ্ন শুধু তাঁদের নয়।

এটি আমাদের প্রশ্ন।

এটি রাষ্ট্রের প্রশ্ন।

এটি বিবেকের প্রশ্ন।

উন্নয়ন হোক—কেউ তার বিরোধিতা করে না।

মিটফোর্ড হাসপাতাল আধুনিক হোক—আমরাও চাই।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ হোক—প্রয়োজন হলে অবশ্যই হোক।

কিন্তু—

মানুষকে গৃহহীন করে নয়।

প্রান্তিক মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে নয়।

পুনর্বাসনের পথ বন্ধ করে নয়।

যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের হাসপাতাল পরিষ্কার করেছেন, তাঁর নিজের ঘর ভাঙার আগে অন্তত তাঁর ভবিষ্যতের একটি ঠিকানা নিশ্চিত করা হোক।

কারণ—

একটি হাসপাতাল শুধু ভবন নয়, মানুষের আশ্রয়ও।

একটি শহর শুধু রাস্তা-দালান নয়, মানুষের জীবনও।

আর একটি রাষ্ট্র শুধু প্রশাসনিক আদেশ নয়—মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারেরও নাম।

আজকের নাগরিক সমাবেশ তাই আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট আহ্বান রেখে গেল—

‘উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন চাই; উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা চাই।’

এই দাবি কোনো একক সম্প্রদায়ের দাবি নয়।

এটি এমন একটি রাষ্ট্রের দাবি, যে রাষ্ট্র উন্নয়ন করবে—কিন্তু কাউকে পেছনে ফেলে নয়।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক‌‌‌ ও মানবাধিকার কর্মী।